এদেরকে রুখে দিন!

 

সাহেদ আলম,

সন্ত্রাসী কার্যকলাপে নাম লেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বসবাসরত বাংলাদেশী অভিবাসদের সন্তানেরা। নিজেরা নিভৃত জগতের বাসিন্দা থাকার পর, হটাৎ করেই একদিন আবিভূত হচ্চে হামলাকারী হিসেবে। যেই দেশে তারা পড়াশুনা করছে, অথবা অভিবাসনের যাবতীয় সরকারী সুযোগ সুবিধা নিয়ে অর্থ উপার্জন করছে, পড়াশুনা করছে সেই সেই দেশের ক্ষতি সাধনে, সাধারন মানুষকে হত্যার মাধ্যমে প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হচ্ছে। এখন আর এটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নেই, পর পর বেশ কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে একট নিদৃষ্ট সংখ্যার তরুনদের মন জগতের চিত্র বেরিয়ে এসেছে।’

সর্বশেষ ঘটনাটি গেল সপ্তাহের ১১ ডিসেম্বরের।ম্যানহাটনে টাইম স্কয়ার সাবওয়ে স্টেশন থেকে বাস স্টেশনে যাতায়াতের ভূগর্ভস্থ পথে বোমা হামলা হয় সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস সোমবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে। নিজের গায়ে থাকা বোমা ফাটাতে গিয়ে হামলাকারী নিজের হাত ও তলপেট পুড়ে ফেলেন। তবে, গুরুতর নয়। এ ঘটনায় আহত আরো তিনজনের অবস্থাও গুরুতর নয়।  নিউ ইয়র্কের গভর্নর এবং মেয়র দু’জনে এ হামলাকে ন্যাক্কারজনক বলেছেন। সন্ত্রাসী হামলা বলে দাবি করেছেন।

হামলাকারীর নাম আকায়েদ উল্লাহ। ২৭ বছরের এই ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে সাত বছর আগে নিউ ইয়র্কে আসেন। আকায়েদ উল্লাহ কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটাতে গেছে সেটার আনুষ্ঠানিক কোন জবানবন্দী বা স্বীকারোক্তি এখনও প্রকাশ হয়নি। নিউইয়র্কের বেলভ্যু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আকায়েদ উল্লাহ তার বিরুদ্ধে আনীত পুলিশের অভিযোগ শুনেছে। বিচারকের করা প্রশ্নের খুব কম উত্তর সে দিয়েছে বলে খবর দিয়েছে মুল ধারার গনমাধ্যমগুলো।  আকায়েদ এর বিরুদ্ধে ৫ ধরনের অপরাধ সংগঠিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এ পর্যন্ত তথ্য উপাত্তে দেখা যাচ্ছে সে, তিন বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস এর প্রতি আনগত্যবোধ দেখিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ১ বছর আগে থেকে সে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। পরিকল্পনা মোতাবেক,  তিন সপ্তাহ আগে, আকায়েদ তার ব্রকুলিনের বাড়িতে পাইপ বোমা তৈরীর যন্ত্রপাতি আর উপাদান জড়ো করতে শুরু করে। তদন্তকারী তার ফেসবুক পেইজ এ ট্রাম্প বিরোধী নানা কথাবার্তার সাথে সাথে তার পার্সপোটে, ‘আমেরিকা তুমি ধ্বংস হও’ সম্বলিত লেখাও লিখে রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত এই হামলা পরিকল্পনাকারী আকায়েদ এর পরবর্তী শুনানী জানুয়ারীর ৩ তারিখ। তার আগ পর্যন্ত তার জামিন হবে না এবং তার পক্ষে কাজ করা এটর্নী তার জামিন চাননি।

অভিযুক্ত আকায়েদ এই ঘটনায় নিজের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেনি। সে কারনে, এই হামলা চেষ্টা যে সে জেনেশুনে করেছে সে বিষয়ে আপাতত ভিন্ন মত নেই কৌশুলীদের।সেটাই অবাক করছে বাংলাদেশী কমিউনিটিকে। একজন প্রায় সমাজ বিচ্ছন্ন ব্যাক্তি এভাবে নিরবে নিভৃতে একটি হামলার পরিকল্পনা করেছে যেটা কেউ জানতে পারেনি এর আগে। তবে, এই লক্ষন, একেবারে অপরিচিত নয়।

এর আগের সর্বশেষ ঘটনাটি মাত্র ৪/৫ মাস আগের। চলতি বছরের আগষ্টে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক জে এফ কে এয়ারপোর্ট থেকে পারভেজ আহমেদ (২২) নামে এক বাংলাদেশি যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র ‘আইএস’-এ ভর্তির জন্য সৌদি আরব থেকে জুনে সিরিয়া যাওয়ার পথে পারভেজকে গ্রেফতার করে সৌদি পুলিশ। এরপর সৌদি পুলিশের সহায়তায় তাকে যুক্তরাষ্ট্র এনে নিউইয়র্ক এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেফতার করা হয়।জুন মাসে তাকে গ্রেফতারের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির ওজোন পার্কে তার বাবার বাড়িতে খোঁজখবর নিতে থাকে এফবিআই। ১৭ জুলাই পারভেজের কম্পিউটারসহ যাবতীয় কাগজপত্র অনুসন্ধান করে এফবিআই নিশ্চিত হয়, তিনি আইএস-এ ভর্তির জন্যই সৌদি আরব থেকে সিরিয়ায় গমন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।এফবিআইর অনুরোধে সৌদি পুলিশ তাকে ২৮ আগস্ট নিউইয়র্কে ফেরত পাঠায়। জে এফ কে এয়ারপোর্টে অবতরণের পরই এফবিআই পারভেজকে গ্রেফতার করে এবং ২৯ আগস্ট ব্রুকলিনে ফেডারেল কোর্টে সোপর্দ করে। পারভেজ তার সিলেটী মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও গ্রহণ করেছেন।

আরেকটি ঘটনা ঘটে, ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনার অভিযোগে এক বাংলাদেশী যুবককে গ্রেফতার করেএফবিআই। কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস (২১) নামের ওই বাংলাদেশীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার ও জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদাকে সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়। ম্যানহাটানে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সামনে ‘বিস্ফোরকভর্তি’ ভ্যান দাঁড় করিয়ে নাফিস পাশের মিলেনিয়াম হিল্টন হোটেলে যান। সেখান থেকে তিনি ভ্যানে রেখে আসা সেলফোনে বার বার কল দিতে থাকেন এক হাজার পাউন্ড (৪৫৪ কেজি) বিস্ফোরকে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য। কিন্তু ভ্যানে সত্যিকারের বিস্ফোরক না থাকায় সেটি আর ফাটেনি। নিউইয়র্ক পুলিশ বলছে, নাফিস আসলে এফবিআইয়ের পাতা ফাঁদে পা দেন। তার ওপর নজর রাখা হচ্ছিল গত জুলাই থেকেই। ভ্যানটি চালিয়ে আসার সময় যে লোকটি তার পাশে ছিলেন, তিনি আসলে এফবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা, যাকে নাফিস চিনতে পারেননি। ব্রুকলিন ফেডারেল কোর্টে নাফিসের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শিক্ষা ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসেন নাফিস। আলকায়েদা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই যুবক সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য বিশ্বস্ত লোক খোঁজা শুরু করার পর গত জুলাইয়ে এফবিআইয়ের নজরে পড়েন। নাফিস এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তছনছ হয়ে যায়। প্রথমে তিনি চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করতে। এরপর তিনি রিজার্ভ ব্যাংক, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাল্টিমোরে সেনাবাহিনীর স্থাপনায় বোমা হামলার পরিকল্পনা করেন। তার এ পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে সহযোগী সেজে এফবিআই কর্মকর্তারাই তাকে ২০ ব্যাগ ‘নকল’ বিস্ফোরক সরবরাহ করেন, যাতে তাকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা যায়।

আই এস,এ যোগদানে প্রস্তুতির সময়, এফবিআইএর হাতে আটক ব্রুকলিনের পারভেজের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছিলেন,  হঠাৎ করেই বদলে যায় পারভেজ। সবকিছু ছেড়ে তিনি নীরব হয়ে যায়। গত জুনে বাবার সঙ্গে সৌদি আরবে যায় পারভেজ। সেখান থেকেই উধাও হয়। ফেডারেল কোর্টে দায়েরকৃত অভিযোগ অনুযায়ী পারভেজ তার তার মা-বাবাকে লিখে জানিয়েছিল, ‘আমি যদি কোনো কারণে নিষ্ঠুর হয়ে থাকি, অতিরিক্ত কিছু করে থাকি, তাহলে ক্ষমা করে দিও। আমি যা তোমাদের শেখাতে চেয়েছি দয়া করে তা স্মরণ করো।

২২ বছরের পারভেজ আমেরিকানদের ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে মন্তব্য করে তাদের খতম করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিল বিভিন্ন স্থানে। ২০১৪ সালের অক্টোবরে পারভেজ একটি পোস্টে লিখেছিল, ‘কারা জিহাদি? অধিকাংশ মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী নিজের ভূমিতে যেসব মুসলমান শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মত্যাগ করেন, তারাই জিহাদি। সত্যিকারের সন্ত্রাসী হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

আর আকায়েদ উল্লাহ জানিয়েছে, সে ইউটিউব এ একটি ভিডিও দেখে সন্ত্রাসবাদ এবং আমেরিকার প্রতি প্রতিশোধ নিতে উদ্বুদ্ধ হয়। পারভেজ এবং নাফিসের ঘটনার মধ্যেও এই একই মিল আছে যে তারা তাদের নিজেদের বিভ্রান্ত যুক্তি আর উগ্র প্রতিবাদ চিন্তায় বিপদে ফেলছে আরো লক্ষ লক্ষা বাংলাদেশীকে, যারা এই দেশের উন্নয়নে অকাতরে শ্রম দিচ্ছে। যারা, এই দেশের টাকা পয়সা দেশে পাঠিয়ে গরীব পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছে তাদের সবার জন্য হুমকি তৈরী করছে কিছু তরুন। এই তরুনদেরকে চিন্হিত করা আর তাদের রুখে দেওয়ার দাবী-ই স্পষ্ট হয়েছে আকায়েদ এর কৃতকর্মের পর।

এই ঘটনাগুলি প্রমান করে যে, এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া বা নিশ্চপ থাকার সময় নেই। বিপথগামী বাংলাদেশী তারুন্যকে এখনই সঠিক পথে নিয়ে আসার ব্যবস্থা না করা গেলে, পুরো যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী বংশোদ্ভুতদের আগামীর অভিবাসন আর জীবনযাত্রা মারাত্বক ভাবে বিপদের মধ্যে পড়বে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট