বিনোদন

পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক চলচ্চিত্র: কেমন হবে ভবিষ্যতের পৃথিবী?1 min read

এপ্রিল ১৭, ২০২০ 7 min read

author:

পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক চলচ্চিত্র: কেমন হবে ভবিষ্যতের পৃথিবী?1 min read

Reading Time: 7 minutes

‘বাসযোগ্য যেকোনো স্থানই ‘পৃথিবী’।‘

কল্পবিজ্ঞানের মহারথী আইজাক আসিমভ সেই পঞ্চাশের দশকে সাধারণ শব্দে সংজ্ঞায়িত করেছেন পৃথিবীকে। অর্থাৎ বহু আলোকবর্ষ দূরের গ্রহও যেকোনো সময় হয়ে উঠতে পারে নতুন বসুন্ধরা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রবল উৎকর্ষের ধারায় চাঁদে পা রেখেছে মানুষ, হিসেব কষছে মঙ্গলকে আবাসযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে। বর্ধিত হচ্ছে প্রযুক্তির নিত্যনতুন আবিষ্কারের তালিকা। তবে এসব প্রচেষ্টাই এক পলকে অর্থহীন হয়ে যায় অজানা মহামারীর কবলে।

অনাকাঙ্ক্ষিত মহামারীর ছোবলে কী ঘটতে পারে মানবসভ্যতার? প্রাণীকুলের জন্মস্থান পৃথিবীর ভাগ্য কীভাবে বদলে যেতে পারে নিমেষেই?

এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা তো আছেই, নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যাও অগণিত। এর মধ্য থেকেই কয়েকটির পরিচয় জেনে নিই আজ।

28 Days Later (2002)

প্রতিষেধক পরীক্ষা কিংবা নব আবিষ্কারের প্রথম ঝাপটাটা লাগে অসহায় প্রাণীকুলের গায়েই। তবে পান থেকে খানিকটা চুল খসলেই বাঁধতে পারে দক্ষযজ্ঞ। অস্কারজয়ী পরিচালক ড্যানি বয়েলের পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক বা বিপর্যয় পরবর্তী চলচ্চিত্র ’28 Days Later’ মোটাদাগে সেই ভয়ংকর সময়েরই আভাস।

সুনসান নীরবতার লন্ডনকে ফ্রেমবন্দি করতে মাত্র ৪০ মিনিট নিয়েছিল প্রোডাকশন দল; Photo: Empire

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগার। শিম্পাঞ্জির উপর প্রয়োগ করা হয় ক্রোধ বর্ধক এক ভাইরাস। গোপনে বেশ ভালোভাবেই চলছিল এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তবে আচমকাই বন্যপ্রাণী অধিকার রক্ষাকারী দলের সদস্যদের হস্তক্ষেপে ছড়িয়ে পড়ে সেই ভাইরাস। ক্রমেই গোটা দেশকে আক্রান্ত করে ভাইরাস। হত্যাকাণ্ড, দাঙ্গা, নির্বিচার অত্যাচারে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় ব্রিটেন।

শহর যখন পুড়ছিল, ছবির প্রধান চরিত্র তখন গভীর নিদ্রায়। নায়কই যদি নিশ্চুপ, তবে শহর বাঁচাবে কে? ঠিক তাই! মাত্র ২৮ দিন আগে দুর্ঘটনায় হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল জিমকে। প্রায় এক মাস বাদে চোখ খুলতেই জুজুর মতো তাকে চেপে ধরলো নীরব হাসপাতাল। চৌহদ্দি পেরুতেই সে আবিষ্কার করে বসে অস্বাভাবিক নীরবতার শহর লন্ডনকে। ভাগ্যক্রমে দেখা মেলে শহরের দুই জীবিত সত্তা- সেলেনা ও মার্কের।

অচিরেই জিম জানতে পারে ভাইরাসের ভয়াল পরিণতির কথা। শহরের অধিকাংশ লোকই মৃত, যারা মৃত নয় তাদেরও ঠিক মানুষ বলা যায় না। পরিত্যক্ত, নির্জন, ভয়ালদর্শন শহরে আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়াতে থাকে তারা। জোটে হানাহ ও ফ্র্যাংকের সঙ্গ। এবার যাত্রা ম্যানচেস্টারে- সেনাবাহিনীর আশ্রয়ে। কিন্তু সেখানে কী অপেক্ষা করছে এই ছোট্ট দলের জন্য? আশার আলো নাকি মানবতার চরম পরাজয়?

জোম্বি জনরার চলচ্চিত্রে একেবারে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছিল ২০০২ সালের এই হরর মুভিটি। এর মূল চরিত্র জিমের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ‘Peaky Blinders’, ‘Dunkirk’ খ্যাত কিলিয়ান মারফি। এছাড়াও নাওমি হ্যারিস, মেগান বার্নস ও ব্র্যান্ডন গ্লেসন ছিলেন কুশীলব তালিকায়। এর চিত্রনাট্যকার অ্যালেক্স গারলেন্ডের  প্রথম কাজও এই ’28 Days Later’.

চলচ্চিত্রের সমাপ্তিতে জিম, সেলেনা ও হানাহর সাথে উদ্ধারকারী দলের দেখা মিললেও আদতে এর যবনিকাটা ঘটেছিল একদম অন্যভাবে। স্ক্রিপ্ট বলছিলো, দিনশেষে জিমের মৃত্যুই হবে একমাত্র পরিণতি। কিন্তু স্বল্প পরিসরে ছবি মুক্তির পর দর্শকের চাহিদানুসারেই জিমকে জীবিত করেন পরিচালক বয়েল। ১১৩ মিনিটের এই ছবি বিশ্বব্যাপী আয় করেছে ৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ছবির সবচেয়ে মজাদার ব্যাপার কী জানেন? এতে ব্যবহৃত জোম্বিগুলো কিন্তু আসলে একেকজন ঝানু দৌড়বিদ!

Children of Men (2006)

২০২৭ সালের এক অবসন্ন বিকেল। শোকতপ্ত লন্ডনের প্রতিটি মানুষ। টেলিভিশনের পর্দায় একই খবর  জারি হচ্ছে। পৃথিবীর সর্বশেষ নবীনতম ব্যক্তিটি জনসমক্ষে খুন হয়েছে। এ যেন শুধু একটি প্রাণবধের খবর নয়, গোটা মানবজাতির জন্য নৈরাশ্যের আহ্বান।

পুরোটা বুঝতে গেলে খানিকটা পিছু ফিরতেই হয়। ২০০৯ সালে সমগ্র মানবজাতি প্রত্যক্ষ করে এক কঠিন বাস্তবতা; যার নাম বন্ধ্যাত্ব। পুরো পৃথিবীই এসময় থেকে ছেয়ে যায় অকাল ঊষরতায়। কোন ঘরেই জন্ম নেয় না নতুন মানবশিশু, জরা-হতাশায় আপাদমস্তক ছেয়ে থাকে মানুষের মন।

এর সাথে যোগ হয়েছে বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু সংকট। একদিকে যেমন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ থেকে তাড়া খেয়ে লোকে আশ্রয় নিচ্ছে ইংল্যান্ডসহ অন্যান্য উন্নত দেশে, অপরদিকে এই দেশগুলোই তাদের তেলাপোকার মতো ছুঁড়ে দিচ্ছে সীমানার বাইরে।

থিও ফারন; সাবেক বিপ্লবীর দ্রোহী চেতনা সময়ের সাথে ক্ষয়ে গেছে বহু আগেই। একমাত্র সন্তানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিচ্ছেদও হয়েছিল ভালোবাসার মানুষ জুলিয়ান টেইলর সাথে। তাও বছর বিশেক পেরিয়েছে। গোটা শহর যখন বিমূঢ় তখনই থিওর জীবনে ফিরে আসে জুলিয়ান।

ছেঁড়া সুরের সংসার নিয়ে স্বপ্ন বুনতেও বসে যায় থিও। কিন্তু এর মাঝে জুলিয়ান জানিয়ে দেয়, উদ্বাস্তুদের পক্ষে লড়ছে সে, বিপ্লবের বিকল্প নেই তার হাতে। তবে এত সংকটেও সে থিওতেই আস্থা রাখে। আর তাই তাদের দলেরই আরেক সদস্যা ‘কি’ কে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবার দায়িত্বটা সে অর্পণ করতে চায় থিওর হাতেই।

মানবজাতির উত্থান ঘটেছিল আফ্রিকা মহাদেশে- এই ভাবনা থেকেই ‘কি’ কে কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে দেখিয়েছেন কুয়ারন; Photo: 3 Brothers Film

দোদুল্যমান মনে থিও সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেও স্বল্প সময়ের মাঝেই টের পায়, এ শুধু একটি বিপ্লবী গোষ্ঠীর ভবিষ্যত নয়; পুরো মানবজাতির অস্তিত্বেরও মহান দায়। কেননা, সেই সদস্যা অর্থাৎ কি হলো গত ১৮ বছরের মাঝে গর্ভধারণে সক্ষম বিশ্বের একমাত্র নারী। এ পরিস্থিতিতে কি কে একমাত্র ‘হিউম্যান প্রজেক্টে’ই সর্বাত্মক সাহায্য করতে পারে, বাঁচাতে পারে অন্ধাকারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে।

এরপরের গল্পটুকু কি আর থিওর অদম্য যাত্রার সাহসী কাহিনী, পাশাপাশি জ্যাসপার, ধাত্রি মিরিয়াম, কিংবা রোমান মহিলা মারিকার আত্মত্যাগেরও নিখাদ প্রতিবেদন। বাকিটুকু জানতে আপনাকে চোখ রাখতে হবে ঘরে থাকা মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দায়।

২০০৬ সালে যখন ছবিটি মুক্তি পায়, খুব একটা সাড়া পায়নি দর্শকদের কাছে। সারাবিশ্বের জনতা তখন তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দেই বাস করছিল। তাই মেক্সিকান পরিচালক আলফোন্সো কুয়ারন যখন বিষণ্ণতায় মোড়া সিনেমাটোগ্রাফির ‘Children of Men’ প্রদর্শন করলেন, লোকে পাত্তাই দিলো না। আন্তর্জাতিক পরিক্রমায় এই চলচ্চিত্রে দেখানো প্রতিটি দৃশ্যই এখন বাস্তব। মেট্রো, স্টেশন, হোটেলে উপর্যুপরি হামলা, বন্দুক হাতে নির্বিচারে হত্যা, শরণার্থী সংকট, বিশ্বনেতাদের উদাসীনতা, ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর মিছিল, মানবাধিকার লঙ্ঘন সহ নানান সমস্যায় জর্জরিত বর্তমান দুনিয়া।

১৪ বছর আগে এই ছবিই অনেকখানি রাজনীতি সচেতন ছিল, বলা যায় সময়ের চাইতে এগুনোও ছিল। বক্স অফিসে ব্যবসা করতে না পারার কারণ মূলত দর্শকদের অজ্ঞানতা ও অদূরদর্শিতা, যার প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত মিলছে বর্তমান সময়ে। ছবির মূল ভূমিকায় অভিনয় করেন ক্লাইভ ওয়েন, জুলিয়ান মুর, ক্লেয়ার হপ ও মাইকেল কেন। অসাধারণ দৃশ্যায়ন তো বটেই সাথে ক্রিমসন কিং, বিটলস আর পিংক ফ্লয়েডের গানগুলোর অনবদ্য ব্যবহার এতে যোগ করেছে স্মৃতিকাতরতার স্বাদ।

পি ডি জেমসের ১৯৯২ সালে লেখা একটি উপন্যাসকে উপজীব্য করে তৈরি করা হয়েছে ছবিটি।  এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয় ২০০৫ থেকে ২০২৭ সালের বিশ্ব পরিস্থিতিকে সামনে রেখে। উপন্যাসে পুরুষের বন্ধ্যাত্বকেই প্রধান হিসেবে দেখানো হলেও মানবিক উপস্থাপনের স্বার্থে কুয়ারন একে নারীতে রূপান্তর করেন।

Snowpiercer (2013)

২০৩১ সালের ধরিত্রী, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষবাষ্প ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাঝেও মানবসভ্যতা টিকে আছে। কীভাবে জানেন? ডিবের মতো একখানা রেলগাড়িকে আশ্রয় করে। বিষম খাচ্ছেন? তবে পুরোটা শুনুন।

পৃথিবীতে পুনরায় আরম্ভ হয়েছে বরফ যুগের। দুঃসময়ে গোটা জাতির ভার নিয়েছে স্বৈরাচার উদ্ভাবক উইলফোর্ড। বিশাল এক রেলগাড়িতে সে পুরে নিয়েছে জীবিত মানুষের দলকে, চলেছে অসীমের পথে। দুইটি মূল ভাগে বিভক্ত ট্রেনটি- যার অগ্রভাগে সমাজের ধনিক শ্রেণির বাস, অন্যদিকে বাস দরিদ্রের। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, প্রাথমিকভাবে সীমিত মানুষ থাকলেও নতুন প্রাণ জন্ম নিলে স্থান সংকুলান হবে কী করে? এরও সমাধান আছে উইলফোর্ডের অভিধানে।

আনুভুমিক শ্রেণি সংগ্রাম ও কল্পকাহিনীর রোমহর্ষক রসায়নই ’Snowpiercer’; Photo: IMDb

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতো উইলফোর্ডও সময়ভেদে কিছু পদক্ষেপ নেয়। অনাহার, শোষণে জর্জরিত দরিদ্র সমাজে তথা ট্রেনের পশ্চাৎভাগে প্রায়ই বিপ্লবে জাগিয়ে তোলে সে, সেই সংঘাতে মৃত্যু ঘটে বহু নাগরিকের, অনেকে পরিণত হয় সমগোত্রীয়ের খাদ্যে। অন্যদিকে প্রভুশ্রেণির লোকেদের জন্য রয়েছে সুস্বাদু খাবার, বিলাসবহুল জীবনের সমস্ত ব্যবস্থা, শিক্ষা ও অপরিসীম আনন্দ। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই নতুন করে মাথা চাড়া দেয় নববিপ্লব; কার্টিস এভারটের নেতৃত্বে।

পশ্চাৎভাগ থেকে শুরু করে ক্রমে এগুতে থাকে নিপীড়িতের সংগ্রাম। সম্মুখে আবিষ্কার করে তাদের প্রতি বঞ্চনার খুঁটিনাটি রূপ, ধনতান্ত্রিক শ্রেণির অবিশ্বাস্য জীবনযাত্রা এবং শঠতার ক্লেদাক্ত পরিচয়। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও কৌশলের মাধ্যমে একসময় কার্টিস বৃদ্ধ উইলফোর্ডের সাক্ষাৎ পায়। অত্যাচারী উইলফোর্ড তাকে নতুন সাম্রাজ্যের প্রস্তাব দিলেও মানবতার স্বার্থে প্রত্যাখান করে সে। কিন্তু এটাই কি বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য ছিল? স্বৈরাচারের পতনের পর মানবজাতির ইতিহাস কীভাবে লেখা হবে?

কাফকার মতে , “প্রতিটি বিপ্লব একসময় বাষ্পীভূত হয়ে বিদায় নেয় আর পেছনে রেখে যায় নব্য আমলাতন্ত্রের ক্লেদাক্ত উত্থান।‘ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পর আশার আলো নিভে যেতেও সময় লাগে না, এর পরিণাম আমরা দেখেছি আরব বসন্তে, জিম্বাবুয়ের মুগাবে সরকারে কিংবা রক্তস্নাত যেকোনো জাতির উত্থানের বেলাতে। ‘স্নোপিয়ারসার’ ও ঠিক সেই বার্তাই পৌঁছে দেয় দর্শকের কাছে। বিল্পবই কি মুক্তি? আর মুক্তিই কি আকাঙ্ক্ষিত পরিণতি না তমসার হাতছানি?

সাকুল্যে দুই ঘণ্টা ছয় মিনিটের মধ্যেই মানবসভ্যতার সার্থক মহাকাব্যিক উপস্থাপন করেছেন বং জুন-হো। জ্যাকুয়েস লোবের ফরাসি গ্রাফিক উপন্যাস ‘La Transperceneige’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে এই অ্যাকশন মুভিটি। এতে অভিনয় করেছেন ক্রিস ইভানস, সং কাং-হো, টিল্ডা সুইনটন, এড হ্যারিস, অক্টাভিয়া স্পেন্সার প্রমুখ। ডার্ক পলিটিক্যাল ও সাইফাই জনরার এই ছবিটির আয় ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

Mad Max Fury Road (2015)

ভরপুর অ্যাকশন, আঁটো কাহিনী, দুর্দমনীয় ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস আর অনন্য নির্দেশনাই পুরো ১২০ মিনিটের জন্য দর্শককে পর্দায় আটকে রাখবার জন্য যথেষ্ট। আর যদি সেটা হয় ক্লাসিক ‘ম্যাড ম্যাক্স’, তবে তো ছক্কা!

প্রায় ১৫ বছর ধরে চলে ‘Mad Max Fury Road’ এর নির্মাণকাজ; Photo:The verge

১৯৭৯ সালের ক্লাসিক ম্যাক্স যাত্রার আগে চলুন একবার দেখে নিই বর্তমান দুনিয়ার হালচাল। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, গোটা পৃথিবীর ৯০ ভাগেরও বেশি সম্পদের মালিক মোট জনগোষ্ঠীর ১ শতাংশ মাত্র। অর্থাৎ গুটিকয়েক লোকের নাচের পুতুল হিসেবেই জীবনযাপন করতে হচ্ছে ৭০০ কোটি প্রাণকে।

এবার ফিরে তাকাই অদূর ভবিষ্যতের ডিস্টোপিয়ান সমাজের দিকে। পৃথিবীর অন্নজল সংকট তীব্র, অধিকাংশ ভূমিই নিষ্প্রাণ, স্বল্প সংখ্যক মানুষই টিকে আছে দূষিত ধরিত্রীর বুকে। কিন্তু এর মাঝেও বিষাক্ত সাপের মতো ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে শ্রেণি সংঘাত, হানাহানি ও সম্পদের অসম বণ্টন। এমনই এক গোষ্ঠীর প্রধান ইমমোরটান জো। তার অন্যায্য আচরণ ও অত্যাচারে নিয়ত বলি হচ্ছে সাধারণ জনতা, অকালে স্নিগ্ধ শৈশব হারাচ্ছে অগণিত শিশু আর সন্তান ধারণে সক্ষম নারীদের বাধ্য করা হচ্ছে যৌন দাসত্বে।

সংকটাপন্ন এই পরিস্থিতিতেই গুপ্ত পরিকল্পনায় নামে ফিউরিওসা (শার্লিজ থেরন)। জোর পাঁচ যৌন দাসীকে নিয়ে পালিয়ে যায় নতুন ভবিষ্যতের সন্ধানে। ওদিকে ক্ষমতালোলুপ, ঘৃণ্য জো ই বা বসে থাকবার পাত্র কেন? তার নির্দেশে ফিউরিওসাকে ধাওয়া করে হাজার হাজার ‘যুদ্ধ পুত্র’।

ভাগ্যচক্রে ম্যাক্স রকাটানস্কির (টম হার্ডি) সাথে আঁতাত করে এগিয়ে যেতে থাকে ফিউরিওসার দল। বিপদসংকুল রাস্তা, অপর্যাপ্ত রসদ সত্ত্বেও শত্রুকে ফাঁকি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ‘সবুজ ভূমিতে’ অবশেষে পৌঁছায় তারা। অথচ স্বপ্নভঙ্গ হয় নিমেষেই! বসুধার সর্বশেষ উর্বর মাটিও ততদিনে দূষিত হয়ে গেছে, নতুন জীবনের আশা বৃথা সেখানে। এই দীর্ঘশ্বাসের মাঝেই জলে টইটম্বুর ‘সিটাডেলে’ ফেরত যাবার উপায় বাতলে দেয় ম্যাক্স। ফিউরিওসার দল নিঃসংকোচে প্রস্তুত হয় নতুন যুদ্ধের- আশা ও ন্যায়ের পক্ষে।

জর্জ মিলারের ‘ম্যাড ম্যাক্স’ সিরিজের আবেদন চার দশক ধরেই সম্মুজ্বল। এরই চতুর্থ কিস্তি ‘Mad Max Fury Road’ মুক্তি পায় ২০১৫ সালে। ছবিতে শুধু বিপর্যয় পরবর্তী অবস্থাই নয় , মানবতা, নারীবাদীতা ও সংগ্রামের চিত্রায়নও হয়েছে সমানতালে।

Cargo (2017)

গতানুগতিক জোম্বি আক্রমণের ছবি থেকে বেশ অনেকটাই আলাদা মার্টিন ফ্রিম্যানের ‘Cargo’. নরখাদকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চাইতে বাস্তবিক মানবিক টানাপোড়েনই ছিল এতে মুখ্য।

বিপর্যস্ত পৃথিবীতে ক্লান্ত এক পিতার সংগ্রাম ‘Cargo’ ; Photo: Medium

ছবির গল্পের পটভূমিতে দেখা যায় অ্যান্ডি, কে ও শিশু রোজির ছোট্ট পরিবারকে। মাসখানেক যাবত তাড়া ভেসে বেড়াচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার জলাভূমিতে। ওদিকে দেশে ক্রমেই ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে সুস্থ স্বাভাবিক ব্যক্তি পরিণত হয়েছে রক্তপিপাসু দানবে।

দেড় মাস বিপত্তি এড়িয়ে চললেও একদিন ঠিকই অ্যান্ডি পরিবার সম্মুখীন হয় ভয়ানক এই সংক্রমণের। মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। স্ত্রীকে হারালেও সন্তান রোজিকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেবার কঠোর অধ্যবসায়ে এগিয়ে চলে অ্যান্ডি। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও শেষ ৪৮ ঘণ্টায় হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকে সে।

এই অভিযানে সে পাশে পায় আদিবাসী কিশোরী থুমিকে। থুমির সংগ্রামটা অন্যরকম। সংক্রমিত বাবাকে নতুন জীবনদানই তার লক্ষ্য। অথচ ঘনিয়ে আসছে শেষ সময়। অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ জঙ্গলে কি শেষ আশ্রয় মিলবে থুমি-রোজির? না নরখাদক হত্যা করবে তাদের? হন্তারক কি পিতা অ্যান্ডিই না অন্য কেউ?

সম্পূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে নেটফ্লিক্স অরিজিনালসের ছবিটি দেখতে হবে। বেন হাউলিং ও ইয়োলন্ডা রামকের পরিচালনায় পোস্ট অ্যাপোক্যালিপ্টিক ছবিটিতে আতঙ্কজনক আবহাওয়ার চাইতে মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টিই ছিল অধিক স্পষ্ট। ফ্রিম্যান ছাড়াও এতে অভিনয় করেছেন সুসি পোর্টারস, এন্থনি ল্যান্ডারস ও সিমোন হেইস।

লেখক- সারাহ তামান্না 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *