প্রাচীন মিশরের বিস্ময়কর ইতিহাস

পিরামিড এক অপার বিস্ময়; Image Source: Unsplash

মমির দেশ, ফারাও-তুতানখামেন আর ক্লিওপেট্রার দেশ মিশর। মিশরের পরিচয়টা হয়তো বেশিরভাগ মানুষের কাছে এমনই। অনেকের প্রাচীন মিশরের নিয়ে আগ্রহও বিস্তর। আর সেই আগ্রহে আরও ঘি ঢেলে দেয় ‘দ্য মামি’ সিরিজের মুভি গুলো। কিন্ত এর বাইরেও কিন্ত জানার শেষ নেই। তাই আজ তুলে ধরছি প্রাচীন মিশরের ১০টি চমকপ্রদ তথ্য।

মমি কি?

প্রাচীন মিশর মানেই মমি-খুব প্রচলিত এক ধারণা। কিন্ত প্রাচীন মিশরে এই প্রক্রিয়াটা এত সহজ ছিল না। প্রচুর সময়, শ্রম আর অর্থ ব্যয় করতে হতো এর পেছনে। সাধারণ জনগণ নয়, শুধুমাত্র সম্রাট এবং তাঁর পরিবারের কোন সদস্যের মৃত্যুর পরেই মমি এবং সমাধি তৈরির প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতো।

তবে এর পেছনে ছিল এক বিস্ময়কর বিশ্বাস। ধর্মীয়ভাবে তাঁরা বিশ্বাস করতো, মানুষের মৃত্যুর পরেও পুনরায় জন্মলাভ করতে পারে এবং সেটা তখনই সম্ভব যখন মৃতের দেহ অবিকৃত ও সুন্দর থাকে। মমি তৈরির প্রক্রিয়াটি ও ছিল বেশ মুনশিয়ানার। সেই প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত লেখা হবে সামনেই। এই পুরো পদ্ধতিতে দেহের আভ্যন্তরীণ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বের করে নেয়া হলেও একমাত্র হার্টটাই রেখে দেয়া হতো। কারণ?  প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, এই হৃদয়ই তাদের পরিশুদ্ধতার প্রমাণ দেবে।

মৃতের প্রতি নৈবেদ্য

মমি করার পরেই কিন্ত শেষ না। এরপরেও নানান ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতেন প্রাচীন মিশরীয়রা। সমাধিস্থ ব্যক্তির ও তাঁর আত্মীয়দের মাঝে খাবার ভাগাভাগির অদ্ভুতরীতি চালু ছিল সেই সময়। পুরোহিতদের অনুমতি ক্রমে মৃত ব্যক্তির পরিজন, ধর্মীয় গুরু প্রমুখ প্রায় সময়ই খাবারদাবারসহ দেখে আসতে পারতেন ব্যান্ডেজে মোড়া মৃতসম্রাট বা সম্রাজ্ঞীর দেহ।

প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ যেতেন সেই সমাধিতে। খাবার ভাগ করে নেয়াই ছিল উদ্দেশ্য। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, প্রতিদিন মৃত ব্যক্তি সেই খাবার আত্মিকভাবে গ্রহণ করেন।

অসাধারণ সব সমাধি আছে কায়রো জুড়ে;
Image Source: Unsplash

লিঙ্গ সমতা

প্রাচীন মিশরের পরিবার প্রথা অনেকটা আজকের আধুনিক সমাজের মতোই ছিল। পুরুষেরা মূলত বাইরের কাজগুলোই বেশি করতেন।আর নারীর দায়িত্ব ছিল গৃহস্থালি ও সন্তান পালন। কাজের ভিন্নতা থাকলেও অধিকারের প্রশ্নে দুপক্ষই ছিল সমান নারীরা ঘরের বাইরেও ছিলেন নিরাপদ এবং কাজে পারদর্শী। সম্পদ অর্জন ও রক্ষণাবেক্ষণে পূর্ণস্বাধীনতা ছিল তাঁদের।

প্রাচীন মিশরের পরিবহন ব্যবস্থা

মরুভূমির দেশ হলে কী হবে, মিশরীয়দের কাছে উট প্রধান বাহন ছিলনা কখনোই বরং ভার বহন ও কাছে পিঠে যাবার বেলায় তাঁদে রপ্রথম পছন্দ ছিল গাধা। তবে পরিবহন ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্যাপিরাস পাতার নৌকোই ছিল তাঁদের প্রধান মাধ্যম বিস্ময়কর এই সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি আর বাণিজ্যের শ্রেষ্ঠ পথই ছিল নীলনদ।

প্রাচীন মিশরের  ভাষা ও বৈচিত্র্য

হায়রোগ্লিফিকের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাথরে খোদাই করা পাখি, মানুষের গুটিগুটি ছবি হায়রোগ্লিফিকের শুরু আর বিস্তৃতি যদিও মিশরীয়দের হাত ধরেই কিন্ত এর ব্যবহার কিন্ত অতটাও বৃহৎ ছিলনা তাঁদের জীবনে। এই ভাষারীতি শুধু ব্যবহৃতহতো বিভিন্ন সমাধি, ধর্মীয় উপাসনালয়, রাজাদের ইতিহাস আর রাজকীয় কোন ঘোষণাপত্রে।

আর অন্যান্য কাজে ব্যবহারের জন্য ছিল হাইরেটিক ভাষা।এই হাইরেটিক হলো হায়রোগ্লিফিকেরই সংক্ষিপ্তরূপ যা পরবর্তীতে ডেমোটিকে রুপান্তরিত হয়। ভাষার যত পরিবর্তনই থাকুক না কেন,  প্রাচীন মিশরীয়দের মোটে ১০% পড়তে জানতেন আর মুখের ভাষা হিসেবে ছিল চলিত মিশরীয় ভাষা।

ফারাও মানেই পিরামিড নয়

সবফারাও বা মিশরীয় সম্রাটই কিন্ত পিরামিড তৈরি করেননি। প্রাচীন মিশরের ইতিহাসকে যদি তিন ভাগে ভাগ করা যায় তাহলে দেখা যাবে অতিপ্রাচীন (খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮৬-খ্রিস্টপূর্ব ২১২৫) ও মধ্যযুগের(খ্রিস্টপূর্ব ২০৫৫- খ্রিস্টপূর্ব ১৬৫৫) সম্রাটেরাই সরাসরি পিরামিড নির্মাণের সাথে যুক্ত। আর অপেক্ষাকৃত আধুনিক বা নিউ কিংডমের (খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০) সম্রাটগণ পিরামিডের বদলে দুইটি আলাদা স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন।এর মধ্যে তাঁদের মমিকৃত দেহ থাকতো পশ্চিমের থিবিস শহরে কোন গোপন প্রকোষ্ঠে আর একটি বৃহৎ সমাধি থাকতো নীলনদের পার্শ্ববর্তী কোন স্থানে। আর এই সমাধিগুলো কিন্ত আদতেই পিরামিড ছিল না।

পিরামিড নির্মাণ নিয়ে ভুল ধারণা

হেরো ডোটাসের মতে পিরামিড নির্মিত হয়ে ছিলো প্রায় ১ লাখ ক্রীতদাসের শ্রমে। কিন্ত এই ধারণা সম্পূর্ণই ভুল গবেষণা ও অন্যান্য মাধ্যমে জানা গেছে যে, দি গ্রেট পিরামিড নির্মিত হয়েছিল ৫,০০০ স্থায়ী শ্রমিক ও ২০,০০০ অস্থায়ী শ্রমিকের শ্রমের সমন্বয়ে।এরা সবাই ছিলেন বেতনভোগী এবং স্বাধীন মানুষ।

ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্য

ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্য নিয়ে নানা জনশ্রুতি থাকলেও আধুনিক পৃথিবীর বিবেচনায় তাঁকে হয়তোবা এতটা সুন্দরও বলা যায় না।প্রাচীন মিশরীয় মুদ্রায় তাঁর যেই মুখের ছাপ পাওয়া যায় তাতে তাঁকে অনেকটা পুরুষালি সৌন্দর্যের ধারকই মনে হয়। তবেইতিহাসবিদ প্লুটারকের মতে, ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্য ছিল তাঁর প্রজ্ঞা, কণ্ঠ ও আচার ব্যবহারে।

প্রাচীন মিশরের বিবাহেররীতি

প্রাচীন মিশরীয়দের ভাইবোনের মধ্যে বিবাহ প্রচলিত ছিল শুধুরাজকীয় ক্ষেত্রেই। সর্বসাধারণের ভেতর এই চর্চা ছিল না মূলত রাজপরিবারের পরিশুদ্ধ রক্ত ও রীতিনীতি পালনের জন্যই এই প্রথা চালু ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাজগোজ

মিশরীয়দের সাজ পোশাক নিঃসন্দেহে অনবদ্য। তবে এই সাজের পেছনে যেমন তাঁদের দুরন্ত আগ্রহ ছিল তেমনি ছিল ধৈর্যও চোখের সাজের জন্য তাঁরা ব্যবহার করতো গ্যালেনা পাউডার, যা চোখে কালো রঙের দ্যুতি আনার পাশাপাশি সূর্যের তাপ থেকেও রক্ষা করত। আর সবুজ রঙের জন্য ম্যালাসাইট পাউডার ছিল তাঁদের প্রথম পছন্দ।

পারফিউম হিসেবে তাঁরা ব্যবহার করতো ল্যাভেন্ডার, লিলি, দারুচিনি, এলোভেরা, গোলাপ প্রভৃতির নির্যাস আর ঠোঁট রাঙাতে ব্যবহার করতেন কোল ও ওক্রার মিশ্রণ।

সাজে দারুণ সৌখিন ছিল মিশরীয়রা;
Image Source: SwaliAfrica Magazine

লেখক- Sarah Tamanna

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট