সৌদি-মার্কিন বন্ধুত্বের একাল সেকাল

সৌদি-মার্কিন বন্ধুত্বের একাল সেকাল; Image Source: fairobserver.com

বিশ্ব রাজনীতিতে সৌদি-মার্কিন বন্ধুত্ব বেশ পুরনো। অনেক ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করেও তাদের বন্ধুত্ব টিকে আছে যুগ যুগ ধরে। এতদিনেও তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেনি এতটুকুন। চলুন জেনে নেওয়া যাক তদের এ সুমিষ্ট সম্পর্কের গোড়াপত্তন ও বর্তমান অবস্থা।

১৯৪৫ সালে সৌদি আরবের প্রথম বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদ এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ততকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট এক ঐতিহাসিক বৈঠক করেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য তেল সরবরাহ করবে। বিনিময়ে আমেরিকা সৌদিকে সব ধরণের সহায়তা দিবে এবং যে কোন পিরিস্থিতিতে পাশে থাকবে। অবশ্য শুধু সৌদি নয় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সাথেও মৈত্রী সম্পর্ক তৈরি করতে থাকে সে সময়।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি এ বিগলিত মনোভাবের কারণ ছিল দুইটি। এক. মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ বিশ্বের একমাত্র তেল উৎপাদনকারী দেশ। দুই. মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগলিক অবস্থান। দুটি কারণই ছিল আমেরিকার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য যেন যুক্তরাষ্ট্রের অনূকুলে থাকে এবং তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকে তাই তারা মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্রের যোগান দিতে লাগল।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি খুব বেশি সফল হয় নি। কারণ ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল ও আরবের দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। যুক্তরাষ্ট্র তখন পড়ে উভয় সংকটে। কারণ দুই রাষ্ট্রই যে তার মিত্র! উপায় না দেখে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষ নেয়। যুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য আমেরিকা ইসরায়েলকে জেট বিমান সরবরাহ করতে থাকে যেন ইসরায়েল আরবকে খুব সহজেই ঘায়েল করতে পারে। যুদ্ধ প্রায় ছয় বছর স্থায়ী হয়। এ পুরো সময়জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে হাজার হাজার টন অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য-যুক্তরাষ্ট্র মৈত্রীতে ফাটল ধরে। সৌদি আরবও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের তেল সম্পদকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। সৌদি আরব ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র চরম তেল সংকটে পড়ে। তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় মার্কিন নাগরিকেরা তেলের অভাবে রাস্তায় গাড়ি চালানোর বদলে সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করতে শুরু করে সেই সময়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের এই বৈরিতা কয়েকমাস পর্যন্ত টিকে ছিল।

তারপর আমেরিকা ইসরায়েল ও ইজিপ্ট এর মধ্যে হতে যাওয়া এক শান্তিচুক্তিতে দালালী করার  মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বৈরিতা দূর করতে কিছুটা সক্ষম হয়। পূর্বের সখ্যতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদেশের কাছে অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। অস্ত্র কিনতে সৌদি আরব জোড় আগ্রহ দেখায়। পাশাপাশি তারা যুক্তরাষ্ট্রে তেল রপ্তানি শুরু করে। ১৯৭০ এর দশকে শুধুমাত্র তেল রপ্তানির মাধ্যমে সৌদি আরব পৃথিবীর ধনী দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়। তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরো উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র কিনে। ১৯৭০ থেকে ‘৭৬ এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সৌদির কাছে বেশ কয়েকটি স্কাই রকেট বিক্রি করে।

একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের মতো ইরানের সঙ্গেও মিত্রতা বজায় রাখে। কারণ ইরানও তেল সমৃদ্ধ একটি দেশ। তার চেয়েও বড় কথা, আমেরিকার চিরশত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের গা ঘেঁষা দেশ হলো ইরান। তাই ইরানকে বশে রাখতে পারলে সোভিয়েত ইউনিয়ন অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে থাকবে। তাইতো যুক্তরাষ্ট্রের ততকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন বলেন, “আমরা ইরানেও তাদের চাহিদা অনুযায়ী  অস্ত্র সরবরাহ করব”। দেখতে দেখতে সৌদি আরব ও ইরান হয়ে যায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দুটি পিলারস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্র এ দু’দেশে প্রচুর পরিমাণে বন্দুক, কামান, জেট বিমান, ট্যাংক প্রভৃতি সরবরাহ করতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য, এতে করে সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশ করতে পারবে না আর তাদের দেশে তেল সরবরাহও নির্বিঘ্নে ঘটবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এটাও জানতে পারবে তাদের দেওয়া অস্ত্র সৌদি আরব ও ইরান কোথায় এবং কখন ব্যবহার করছে। যেটা জানা যেকোন দেশের জন্যই খুব জরুরি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এমনভাবে পরিকল্পনা করল যেন এক ঢিলে দুই পাখি না, তিন চারটা পাখি মারা যায়!   

যুক্তরাষ্ট্রের পাতা ফাঁদ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পদলেহী নেতা শাহকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনী। তিনি চরম আমেরিকা বিদ্বেষী এবং তিনি আমেরিকাকে ‘গ্রেট শয়তান’ বলে আখ্যা দেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দুটি পিলারের একটি ভেঙ্গে পড়ে। শুধু আমেরিকা নয় সৌদি আরবও ইরানের শত্রুতে পরিণত হয়। কারণ দুটি রাষ্ট্রই নিজেদেরকে মুসলিম বিশ্বের নায়ক মনে করে। ফলে দু’দেশই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকে নিজেদের দিকে প্রভাবিত করতে থাকে। সেজন্য সৌদি আরব আমেরিকা থেকে আরও বেশি বেশি অস্ত্র আমদানি করতে থাকে। ইতিমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যপ্রাচ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে ফেলে। তারাও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক ও সিরিয়ায় উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র রপ্তানি শুরু করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র রপ্তানির তুমুল প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। দেখতে দেখতে সৌদি আরব অস্ত্র আমদানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থান অর্জন করে।   

তখন যুক্তরাষ্ট্রে এমন অপরিকল্পিত অস্ত্র রপ্তানি নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অনেকেই মনে করেছিল এভাবে অস্ত্রের বন্যা বইয়ে দিলে মধ্যপ্রাচ্যে কিছুতেই শান্তি আসবে না। যে করেই হোক এ ধরণের প্রতিযোগিতামূলক অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান এতে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি ১৯৮৬ সালের ৫ জুন সৌদি আরবে আরও ২৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দেন। তাঁর দাবি, প্রস্তাবিত এ অস্ত্র আমদানি করে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু কংগ্রেসের অনেকেই বললেন, প্রতিরক্ষার নামে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে হবে। বিগত ৩০ বছর ধরে আমেরিকা সৌদি আরবের কাছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে। আমেরিকা অন্য কোন দেশের নিকট এত অস্ত্র বিক্রি করে নি। প্রেসিডেন্ট রিগ্যান যুক্তি দেখালেন, অস্ত্র বিক্রি সৌদির সাথে মিত্রতার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের বন্ধুত্বের চল্লিশের বেশি বছর কাটিয়েছি। এটা আমাদের উভয়ের জন্য লাভজনক”।   

কংগ্রেস অস্ত্র চুক্তিতে কিছু পরিবর্তন আনার জন্য জোরারোপ করে। ফলে ইউএস-সৌদি মৈত্রী কিছুটা বিসর্জন দিতে হয়। কিন্তু তাদের পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরশীলতা এতটুকুন কমেনি। এদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিয়ে শঙ্কার পরিসমাপ্তি হয় যখন ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায়। কিন্তু সৌদি-আমেরিকার নতুন হুমকি হিসেবে আলোচনায় আসে ইরাক। তখন ইরাকের শাসনভার ছিল সাদ্দাম হোসেনের হাতে। ১৯৯০ সালে সৌদির মিত্র কুয়েতকে ইরাকি বাহিনী আক্রমণ করে। এ সময় সৌদি বাদশাহ কুয়েতের রাজপরিবারকে আশ্রয় দেন। আর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকি বাহিনীকে পরাস্ত করার জন্য কুয়েতে হামলা চালায়। ১৯৯৩ সালে ইরাকের অতর্কিত হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশ কিছু অস্ত্র আমদানি করে।

এই অস্ত্র বিক্রি ১৯৯০ দশকের শেষ দিকে কিছুটা কমে যায়। কারণ ২০০১ সালে আল-কায়েদা কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর আটককৃত সন্ত্রাসীদের মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ১৯ জন ছিল সৌদি নাগরিক। কিন্তু ততকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সৌদির প্রতি অতটা রুষ্ট হন নি। বরং ২০০৩ সালে সৌদি আরবকে সঙ্গে নিয়ে ইউএস ইরাককে হামলা করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

পরবর্তী দশকে মধ্যপ্রাচ্যে জোট ভাঙতে শুরু করে। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ইরান লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকের জঙ্গি গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়। সৌদি আরব ধ্বংসাত্মকভাবে তাদের অস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। এরই জের ধরে ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট মনসূর হামিদের সমর্থনে হুথী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরু করে। তিন বছর ধরে চলা এ যুদ্ধে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক মারা যান। সৌদি আরবের দাবি, তারা ইয়েমেন সরকারকে রক্ষার জন্য এ আন্দোলন চালিয়েছে। কিন্তু বাস্তবিকভাবে এ যুদ্ধে সৌদি আরব মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। ২০১৮ সালের ৯ আগস্টে ইয়েমেনের দাহিয়ান শহরে সৌদি আরব কর্তৃক একটি যুদ্ধ বিমান থেকে বোমা বর্ষন করা হয়। বোমাটি একটি স্কুল বাসের উপর বিস্ফোরিত হয়। এতে বাসের মধ্যে থাকা শিশুদের মধ্যে চল্লিশ জন শিশুর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় বিশ্ববাসী তীব্র নিন্দা জানায়।

এর পরপরই সৌদি আরব বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আরেক নেক্কারজনক ঘটনার অবতারণা করেছে। তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে ইউএস ভিত্তিক সাংবাদিক জামাল খাশগজির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। বলা হচ্ছে, সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি-ইউএস বন্ধুত্বে কিছুটা ফাটল ধরেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত মি. খাশোগি হত্যার সুষ্ঠু বিচার না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সৌদি আরবে অস্ত্র বিক্রি সমর্থন করব না। আমেরিকা কখনো স্কুল বাসের শিশুদেরকে হত্যার সমর্থন করে নি। তাই আমি ইয়েমেন যুদ্ধকেও আর সমর্থন করছি না।”

তাহলে সত্যিই কি যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দিবে? এটার উত্তর এত সোজা নয়। 

আরও পড়ুন – সৌদি আরবের হাতে পারমাণবিক প্রযুক্তি তুলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

লেখক- নিশাত সুলতানা 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

সর্বাধিক পঠিত