গুগলের নতুন চমক- সেলফ-ড্রাইভিং ট্যাক্সি!

Image Source: forbes.com

সেলফ-ড্রাইভিং গাড়ি! শুনতেই ভবিষ্যতের কোন প্রযুক্তি বলে মনে হচ্ছে, তাইনা? এই ধরনের প্রযুক্তি আমরা বেশ কিছু সায়েন্স ফিকশন মুভিতে দেখেছি হয়তো। তবে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি বলে মনে হলেও এই সেলফ-ড্রাইভিং গাড়ি এখন একদমই বাস্তব হয়ে উঠেছে। এই ধরনের গাড়ি চলতে কোন চালকের প্রয়োজন হবে না—আপনি কেবল গাড়ীতে উঠবেন এবং আপনার গন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করবেন। ব্যাস, নিজে থেকেই চলতে শুরু করবে এই গাড়ি।

গুগল প্রতিষ্ঠার প্রায় দশ বছর থেকেই তারা গোপনে নতুন ধরনের একটি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছিল। মূলত কোন ধরণের ড্রাইভার ছাড়াই সম্পূর্ণ রোবোটিক এবং অটোমেটিক পদ্ধতিতে একটি গাড়ি চলতে পারবে, এটাই ছিল গুগলের নতুন এই গবেষণার মূল লক্ষ্য। দীর্ঘ গবেষণা এবং অপেক্ষার পর গুগল অবশেষে চালু করল প্রথম সেলফ-ড্রাইভিং ট্যাক্সি।

গুগলের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান Waymo প্রথমবারের মত এরিজোনা রাজ্যের ফিনিক্স শহরে ছোট আকারের এই সেলফ-ড্রাইভিং গাড়িটির সাথে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিল। তাদের ভাষ্যমতে মানুষ যেমন করে উবার এবং লিফট ট্যাক্সি সার্ভিসে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে ঠিক একই পদ্ধতিতে নতুন এই সেলফ-ড্রাইভিং ট্যাক্সির সার্ভিস তারা গ্রহণ করতে পারবে। তবে যেহেতু তারা প্রথমবারের মত পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে, তাই যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা অথবা যান্ত্রিক ক্রুটি এড়ানোর জন্য আপাতত তাদের নতুন এই ট্যাক্সিতে একজন করে ড্রাইভার বসে থাকবে।

প্রতিটি সেলফ-ড্রাইভিং গাড়ির সাথে আপাতত একজন করে ড্রাইভার থাকা প্রসঙ্গে Waymo কোম্পানির CEO জন ক্রাফসিক একটি ব্লগ পোস্টে বলেন, “আমরা আশা করছি Waymo আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে এবং অনেক বেশি মানুষ নতুন এই সেলফ-ড্রাইভিং গাড়ির সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তাই প্রতিটি পদক্ষেপ আমরা খুব সতর্কতার সাথেই নিচ্ছি”

তিনি আরো বলেন, “প্রায় দশ বছর আগে গুগল সেলফ-ড্রাইভিং গাড়ির এই প্রকল্পটি শুরু করে। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটাই, আর সেটা হলো—কীভাবে আমরা এই সেলফ ড্রাইভিং গাড়ির মাধ্যমে মানুষের যাত্রা আরো বেশি নিরাপদ করে তুলতে পারি!”

Waymo এর এই গাড়িটি কিন্ত শুধুমাত্র জিপিএস দিয়েই চলেনা, কেননা জিপিএস কখনই নির্ভুল ন্যাভিগেশন দিতে পারে না। আর তাই এই গাড়িটি চলার জন্য জিপিএস এর সাথে বিশেষ ধরনের সফটওয়্যারের মাধ্যমে গাড়িটিতে যুক্ত করা হয়েছে আরো বেশ কিছু ধরনের সেন্সর। এই সেন্সর, সফটওয়্যার এবং জিপিএস এর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গাড়িটি নিজ থেকে চলতে সক্ষম হবে। এই গাড়িটির বাইরের অংশে এক ধরনের এন্টেনা থাকে, যেটা সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে জিপিএস এর তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। এছাড়া গাড়ির সফটওয়্যারে প্রতিটি রাস্তার খুঁটিনাটি অনেক তথ্য দেয়া থাকে যেগুলোকে পর্যালোচনা করতে করতে গাড়িটি সামনের দিকে এগিয়ে চলতে থাকে।

এই গাড়ির উপরের দিকে লিডার নামক এক ধরনের সেন্সর থাকে, যেটা ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরার মত চারপাশের সবকিছু সম্পর্কে তথ্য গ্রহ ণকরে। এই লিডার ছাড়াও গাড়ির স্ক্রিনের উপরে লাগানো থাকে বিশেষ ধরনের একটি ক্যামেরা যেটা চারপাশের উপর নজর রাখতে গাড়িকে সাহায্য করে। এছাড়া চারটি র‍্যাডার লাগানো থাকে গাড়িতে, যার মধ্যে দুইটি সেন্সর গাড়ির সামনের দিকে এবং দুইটি সেন্সর গাড়ির পেছন দিকে থাকে।

২০০৯ সালের দিকে গুগল খুব গোপনে এই প্রকল্পটির কাজ শুরু করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এরিজোনা শহরে প্রথমবারের মত এই প্রকল্প চালু করাটা কিছুটা সহজ ছিল। কেননা অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় সেলফ-ড্রাইভিং গাড়ি সম্পর্কিত নিয়মনীতি তুলনামূলকভাবে এই রাজ্যে কিছুটা শিথিল।

ফিনিক্স শহরে টেম্প নামক এলাকার শুধুমাত্র দশমাইল জুড়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রকল্পটি চালু করা হয়। তবে এই এলাকায় কিছুদিন আগেই উবারের একই ধরনের সেলফ-ড্রাইভিং প্রযুক্তির একটি গাড়ি অন্ধকার একটি রাস্তায় একজন পথচারীকে আঘাত করে এবং সেই দুর্ঘটনায় পথচারীটি মারা যান। এই দুর্ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরণের উদ্বেগ নিয়ে আসে যে—এই সেলফ-ড্রাইভিং প্রযুক্তিটি কি আসলেই নিরাপদ কিনা?

এই সম্পর্কে ন্যাভিগেশন গবেষক স্যাম বলেন, “আমার ধারণা  উবারের এই দুর্ঘটনাটি Waymo কে কিছুটা স্থবির করে দিয়েছে”। তিনি আরো বলেন, “এভাবে যদি আরো মানুষ মারা যায় তাহলে এই ধরনের গাড়ির প্রতি মানুষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আরো প্রবল আকারে বেড়ে যাবে”

এছাড়া এই ধরনের যুগান্তকারী সম্ভাবনাময় নতুন ধরনের প্রযুক্তির জগতে শুধুমাত্র গুগলই একমাত্র পথচারী নয়। উবার এবং টয়োটা এক হয়ে গত আগস্ট মাসে একই ধরনের সেলফ-ড্রাইভিংগাড়ি বানায়। টেম্প এলাকায় এই ধরনের দুর্ঘটনার পরেও গত অক্টোবর মাসে হোন্ডা কোম্পানি জেনারেল মোটরের সেলফ-ড্রাইভিং প্রযুক্তির এক প্রকল্পে প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে।

গুগলের Waymo নামক এই সার্ভিসটি প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র একশজন রাইডারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং এই রাইডাররা ইতোমধ্যেই এপ্রিল,  ২০১৭ সালে পরীক্ষামূলক প্রকল্পে বিনামূল্যে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে এই প্রকল্পটি ফিনিক্স শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা জুড়ে চালু থাকবে।

প্রাথমিক পর্যায়ের সেবা গ্রহণকারী একজন যাত্রী রিউট এই সম্পর্কে বলেন, তিনি যখন পরীক্ষামূলকভাবে এই গাড়ীতে উঠেছিলেন তখন এই যাত্রাটা বেশ ধীর গতির ছিল এবং গাড়িটিতে মৃদু ঝাঁকি দিচ্ছিল। প্রায় পনের মিনিট ধরে চলা তিন মাইল যাত্রাতে তার খরচ পড়েছিল ৭.৫৯ মার্কিন ডলার, যেটা তুলনা মূলকভাবে লিফট ট্যাক্সি সার্ভিসের তুলনায় কিঞ্চিৎ বেশি। তিনি বলেন, একই ধরনের যাত্রায় লিফট থেকে ভাড়া এসেছিল ৭.২২ মার্কিন ডলার।

লেখক- Iqbal Mahmud

সাম্প্রতিক পোস্ট

সর্বাধিক পঠিত