বিশ্ব অর্থনীতি ও চীনের অর্থনৈতিক উত্থান

Photo Credit: imgcop.com

আমাদের দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে চীন পরিচিত “গ্লোবাল ফ্যাক্টরি” হিসেবে। চীনে তৈরিকৃত মোবাইল ফোন আমাদের দেশের কম আয়ের মানুষকেও মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছিল ব্যাপকভাবে। মাঝে মাঝেই অনেককে বলতে শোনা যায়, “দুনিয়ায় এমন কিছু নেই যেটি চীন বানায় না”। এটি একটি কথার কথা হলেও, বাস্তব অবস্থা কিন্ত এর কাছাকাছিই।

সেই ১৮৭২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই ছিল বিশ্ব অর্থনীতির লাগাম। কিন্ত চীন যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে একক দখল নিয়ে নেওয়া এখন সময়ের ব্যাপারই বলা যায়। ২০১৭ সালের হিসাব বলছে ২৩.২৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে চীনের অবস্থান এখন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই।  । এই লেখায় আমরা বিশ্ববাজারে চীনের উত্থান ও এর পিছনের কারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো।

শুরুতেই একটি ভুল ধারণা দিয়ে শুরু করা যাক। আমাদের অনেকেরই ধারণা চীন মানেই কম দামি, ক্ষণস্থায়ী প্রোডাক্ট। কিন্ত বাস্তবে অ্যাপেল, মাইক্রোসফট, ক্যানন, সনির মতো বিশ্বসেরা ব্র্যান্ড তাদের প্রোডাক্ট উৎপাদন করে চীন থেকে। পুরো বিশ্বের প্রায় ৬০% ব্র্যান্ডেড লাক্সারি পণ্য চায়নায় তৈরি করা হয়।

১৯৯০ সালে পুরো পৃথিবীর কারখানাজাত প্রোডাক্ট (Manufacturing Product) নির্মাণে চীনের অবদান ছিল মাত্র ৩%। ২০১৮ সালে এসে সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ২৫% এ। অর্থাৎ, পুরো পৃথিবী জুড়ে যত কারখানাজাত প্রোডাক্ট উৎপাদন হয় তার ৪ ভাগের ১ ভাগ চীন একাই উৎপাদন করে।

পুরো পৃথিবীর মোট উৎপাদিত এসির (Air Conditioner) ৮০% শুধুমাত্র চীনে উৎপাদিত হয়, এ ছাড়াও পৃথিবীজুড়ে মোট উৎপাদিত মোবাইল ফোনের ৭০%, জুতার ৬০%, সোলার সেলের (Solar Cell) ৭৪%, সিমেন্টের ৬০%, জাহাজ নির্মাণের (Ship Building) ৪৫%, ষ্টীলের ৫০% চীন একাই উৎপাদন করে। একটি মজার ব্যাপার হলো বিশ্বের মোট উৎপাদিত আপেলের ৫০% চীন থেকে আসে। আপেল উৎপাদনে দ্বিতীয় দেশটি যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের মোট উৎপাদিত আপেলের মাত্র ৬% আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

চীনের অবিশ্বাস্য উন্নতির পেছনের কারণ-

দূরদর্শী নেতৃত্ব 

চীনের সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের নেতাদের অসাধারণ দূরদর্শিতা। আমাদের মতো উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক দেশে নেতারা সাধারণত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেন ৫ বছরের কথা মাথায় রেখে, সোজাভাবে বললে এক নির্বাচন থেকে আরেক নির্বাচন পর্যন্ত থাকে তাদের পরিকল্পনার ছক। কিন্ত চীনা নেতারা কমপক্ষে আগামী ২৫ বছরের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করেন। বিশ্বব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, চীন ১৯৭৮ সাল থেকে মার্কেট বেসড ইকোনমি হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর থেকে তাদের ৮০০ মিলিয়নের (৮০ কোটি) বেশি জনগণকে দারিদ্র সীমা থেকে মুক্ত করতে পেরেছে।

ব্যাপক ও বিস্তৃত উৎপাদন ব্যবস্থা 

আজকে চীনের গ্লোবাল ফ্যাক্টরি হিসেবে পরিচিতির অন্যতম কারণ হলো তারা যেকোনো ক্ষেত্রে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থাকে অনেক বড় আকারে নিয়ে যায়। এতে উৎপাদন খরচ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। যারা ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে ন্যূনতম চিন্তা ভাবনা করেন তারা একটা উদাহরণ দিলেই বুঝবেন। ধরেন আপনি ১০০ পিছ প্যান্ট বানাবেন, আর একজন ১০০০ পিছ বানাবে। এখন নিজেই উত্তর দিন কার খরচ কেমন পড়বে? নিশ্চয়ই যে ১০০০ পিছ বানাবে তার খরচ কম পড়বে। যেকোনো প্রোডাক্টের উৎপাদন স্কেল বা আকার বাড়লে তাতে কাঁচামাল কিনতে কম টাকা লাগে, সেই সাথে আনুসাঙ্গিক আরও অনেক কিছুরই দাম কমে যায়।

কপি-পেস্ট 

একটি কাজ চীন অসাধারণ দক্ষতায় করে। সেটা হলো অন্যান্য কোম্পানির প্রোডাক্ট কপি করা। এতে তাদের উদ্ভাবন করতে যে খরচ করতে হতো সেটা বেঁচে যায়, সেই সাথে রিসার্স ও ডেভলপমেন্টের পেছনেও তাদের সময় এবং খরচ দুটোই বেঁচে যায়। চীনের ছোট বড় কোম্পানিগুলো এই কাজটি করে মূলত স্বল্প উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বাজারের কথা চিন্তা করে।

দক্ষ শ্রমিক 

চীনের শ্রমিকরা অন্যান্য যেকোনো দেশের শ্রমিকদের চেয়ে বেশি প্রোডাক্টটিভ। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে তাদের কাজ করার দক্ষতা এবং ম্যানেজমেন্ট স্কিল দুটোই বাড়ানো হয়। এ ছাড়াও তাদের সম্পূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থায় অটোমেটিক মেশিনের ব্যবহার কম খরচ এবং কম পরিশ্রমে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা চীন আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শক্তিশালী পরিকাঠামো 

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না থাকায় চীনের উন্নয়ন আরও বেগবান হয়েছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক অবস্থা এবং জটিল আমলাতন্ত্র নতুন কোন উদ্যোগে বিনিয়োগের পথে অনেক বড় বাধা। কিন্তু চীন দেশে তাদের জনগণ বিনা দ্বিধায় এবং বিনা বাঁধায় নিজের ব্যবসা দ্বারা করাতে পারে। স্থিতিশীল সরকার, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো (Infrastructure) অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার তারা স্বাভাবিকভাবেই অন্য দেশের থেকে নিজেদের এগিয়ে থাকে।

একটা দেশের অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো (Infrastructure) ভালো না হলে প্রতি পদে পদে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। চীনের উন্নত হাইওয়ে, রাস্তাঘাট, সমুদ্র বন্দর, বিমান বন্দর তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের খরচও কমিয়ে দিয়েছে।

সরকার ও ইন্ডাস্ট্রির অংশীদারিত্ব

চীনের সরকার এবং ইন্ডাস্ট্রি পাশাপাশি হাত ধরে চলে। বর্তমান অবস্থায় চীন ঋণের ফাঁদে এক এক করে অনেক দেশকে আটকে ফেলছে। কীভাবে এবং কেন চীন এমন ঋণের ফাঁদ বুনছে সেটি একটি ভিন্ন আলোচনা। কিন্ত কোনো দেশকে ঋণ দেওয়ার সাথে সাথে সেই দেশে রাস্তাঘাট, রেলপথ, বিমানবন্দর যাইহোক না কেন সেটি নির্মাণের জন্য তাদের দেশের কোন কোম্পানিকে সেই কাজটি দেওয়ার শর্ত জুড়ে দেয়। এতে একরকম বলা যায় তাদের নিজেদের টাকা নিজদের ঘরেই থাকে।

বর্তমান বিশ্বে যেখানে দেশে দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ প্রকট হয়ে উঠছে, সেখানে চীন নিরন্তর সংগ্রাম করে ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন সাধনে অনেকটা পথ এগিয়েছে। নিজ দেশের জনগণের দারিদ্র্যতা কমানোর পাশাপাশি, তাদের জীবনযাত্রার মানের ব্যাপক উন্নতি ঘটিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৩০ নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতির একক অধিপতি হয়ে উঠবে চীন।

পুরো বিশ্বে নিজেদের প্রভাব আরও জোরদার করতে চীনের নতুন উদ্যোগ ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড। বাংলাইনফো টিউব এর নলেজ শেয়ার পর্বে এসব বিষয় নিয়ে তথ্যবহুল আলোচনাটি দেখুন-  

লেখক- Hasan Uz Zaman

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

সর্বাধিক পঠিত