ইতিহাস

সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের দর্পনে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য ও তার রাজধানী কনস্টান্টিনোপল1 min read

ফেব্রুয়ারী ২২, ২০২০ 5 min read

author:

সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের দর্পনে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য ও তার রাজধানী কনস্টান্টিনোপল1 min read

Reading Time: 5 minutes

ইস্তানবুল। বসফরাস প্রণালীর তীরে অবস্থিত এশিয়া ও ইউরোপ উভয় মহাদেশের অন্তর্গত ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরপুর এই শহরটি বর্তমানে তুরস্কের অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ইস্তানবুল এক সময়কার পরাশক্তি পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে কনস্টান্টিনোপল নামে পরিচিত ছিলো, যা ১৪৫৩ সালে উসমানি সম্রাজ্যের অধীনে আসে এবং একে ইসলাম বুল (ইসলামের শহর) নামকরন করা হয়। ১৯২৩ সালে উসমানি খেলাফত বিলুপ্ত হবার আগ পর্যন্ত এটি ছিল উসমানি সম্রাজ্যের রাজধানী। 

বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য ও এর রাজধানী কনস্টান্টিনোপল এর রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। এই ইতিহাসের কিছুটা আজ আপনাদের সামনে উপস্থাপন  করব।

ইস্তানবুল শহরের একাংশ

 ইস্তানবুলের উত্তরে কৃষ্ণসাগর ও দক্ষিণে মারমারা সাগর যুক্ত হয়েছে বসফরাস প্রণালী দ্বারা। বর্তমানে ইউরোপীয়ান অংশে অবস্থিত গোল্ডেন হর্ন ছিল কনস্টান্টিনোপলের খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাভুমি যা বসফরাস প্রণালীতে মিশেছে। এই গোল্ডেন হর্ন কনস্টান্টিনোপল দুর্গকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য পরিখা হিসেবে ব্যবহৃত হত। রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে ছিলো বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের দুর্ভেদ্য দূর্গ। বলা হত কনস্টান্টিনোপলের পতন মানে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের পতন। তাই এই দুর্গকে রক্ষার জন্য রোমান বাইজেন্টাইনরা তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলো।

 বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য বা বাইজেন্টিয়াম মূলত পূর্ব রোমান সম্রাজ্য নামে পরিচিত। রোম কেন্দ্রিক বিশাল ও শক্তিশালী রোমান স্ম্রাজ্য একসময় ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, মিশর ও আরবের বিশাল অংশ নিয়ে গঠিত ছিল।

কনস্টান্টিনোপল মুলত গ্রিক আইনে পরিচালিত হত। এর প্রধান ভাষা ছিল ল্যাটিন ও গ্রিক –  কইন গ্রিক (৩৯৫-৬১০), মধ্যযুগীয় গ্রিক (৬১০-১৪৫৩)। ৩০০ শতাব্দীর আগে রোমানরা বিভিন্ন গ্রিক দেবতাদের উপাসনা করতো। সম্রাট প্রথম কনস্টান্টাইন প্রথম রোমান সম্রাট হিসেবে খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করেন এবং ৩২৫ সালে নিকিয়ার কাউন্সিলে এর স্বীকৃতি দেন। ৩৮১ সালে খ্রিস্টধর্ম বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এর আগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহনকারীদের উপর রোমান সম্রাটরা ব্যাপক নির্যাতন করেছিল। ১০৫৪ সালে ইস্টার্ন অর্থোডক্স মতবাদের প্রচলন ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। 

ইতিহাসবিদদের মতে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের প্রথমদিকে প্রাচীন গ্রিক মেগান জাতি বসফরাসের তীরেচালসেডননামে অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে, পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ৬৫৭ সালে মেগান সম্রাট বাইজাসবাইজেন্টিয়ামনামে  এখানে একটি শহর স্থাপন করেন। শহরটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য বন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এরপর কয়েক শতাব্দী ধরে পর্যায়ক্রমে পারসিয়ান, এথিনিয়ান, স্পার্টান এবং মেসোডোনিয়ানদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। এর মধ্যে রোমান সম্রাট অগাস্টাস (খ্রিস্টপূর্ব ২৭- ১৪ খ্রিস্টাব্দ), ও ট্রাজান (৯৮-১১৭) এর সময়ে স্পেনসহ পশ্চিম-দক্ষিণ ইউরোপ, মেসোপটেমিয়াসহ পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা রোমান সম্রাজ্যের অধীনে আসে।

সম্রাট অগাস্টাস ও ট্রাজান এর সময়কালীন রোমান সম্রাজ্য

খ্রিস্টাব্দ ১৯৫ সালে রোমান সম্রাট সেপ্টিমিয়াস সেভেরাস এই শহরে ব্যাপক ধবংস সাধন করে কিন্তু  বাইজেন্টাইন অধিপতিরা ধীরে ধীরে শহরটি পুনঃনির্মান করেন। ২৯৩ সালে সম্রাট ডায়োক্লেস্টিয়ানের আমলে রোমান সম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিম অংশে ভাগ হয়ে যায়।  

সম্রাট কনস্টান্টাইনের উত্থানকাল

৩২৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট প্রথম কনস্টান্টাইন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লিসিনিয়াসকে পরাজিত করার পর রোমান সম্রাট হন এবং বাইজেন্টিয়ামে নোবা রোম (নতুন রোম) নামে রাজধানী স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিভক্ত সম্রাজ্যকে একীভূত করেন। ৩৩০ সালে সম্রাট কনস্টা্নটাইন এই শহরের নাম দেন কনস্টান্টিনোপল। তার মৃত্যুর পর সম্রাট থিওডোসিয়াস ৩৯৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। থিওডোসিয়াসের মৃত্যুর পর রোমান সম্রাজ্য পুনরায় পশ্চিম রোমান ও পূর্ব রোমান সম্রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। থিওডোসিয়াস ছিলেন উভয় অংশ রাজত্বকারী সর্বশেষ সম্রাট। তিনি তার সম্রাজ্যে পৌত্তলিক ধর্ম নিষিদ্ধ করেছিলেন। পশ্চিম অংশ এক শতাব্দীর মধ্যে ধবংস হয়ে গেলেও পূর্ব অংশ বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য হিসেবে এক হাজারের বেশি সময় পর্যন্ত টিকে ছিলো। 

বিভক্ত পশ্চিম ও পূর্ব রোমান সম্রাজ্য

৩৯৫ সাল থেকে ৪০৮ সাল পর্যন্ত সম্রাট থিওডোসিয়াসের ছেলে আর্কাডিয়াস পূর্ব রোমান সম্রাজ্যের অধিপতি হন। এরপর উল্লেখযোগ্য শাসক হিসেবে সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ান দ্য গ্রেট ৫২৭ সালে ক্ষমতায় আসেন আর ৫৬৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তার শাসনকালকে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়। তিনি ইতালিসহ পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকার অনেক অংশ নিজের রাজত্বের অধীনে আনেন। বিখ্যাত হাজিয়া সোফিয়াসহ অনেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা তার আমলে নির্মিত হয়। রোমান আইন সংশোধন, সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করে রাজ্যকে শক্তিশালী করেন। জাস্টিনিয়ানের মৃত্যুর পর বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যে ক্ষয় শুরু হয়। বিশেষত ৬১০ সালে সিংহাসনে বসা হেরাক্লিয়াসের আমলে মুসলিমদের কাছে আরব ও উত্তর আফ্রিকার ভূমি হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপরের শাসক হিসেবে তৃতীয় লিও (৭১৭-৭৪১), দ্বিতীয় বাসিল (৯৭৬-১০২৫), প্রথম এলেক্সিস (১০৮১-১১১৮), এগারো কনস্টাইন্টাইন (১৪৪৯-১৪৫৩) উল্লেখযোগ্য। 

৮৬৭ সালে সম্রাট প্রথম বাসিলের সিংহাসন লাভের মাধ্যমে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যে মেসোডোনিয়ান রাজবংশের রাজত্বের সূচনা হয় যা পরবর্তী প্রায় আড়াই শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো। এই সময়েও বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য স্বর্ণযুগ পার করে। তবে এর পূর্বে নবম শতকের প্রথম দিকে বুলগেরিয়ান ও মুসলিম আব্বাসি খেলাফতের আক্রমণে সম্রাজ্য বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। এছাড়া ৭১৭-৮৬৭ সময়কালকে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের “আইকনিক্লাজমের যুগ” বলা হয়।

সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ান ও তার পরবর্তী সময়ের বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য

ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত মারমারা সাগর, বসফরাস প্রনালী ও কৃষ্ণ সাগরের কারনে যুদ্ধ কৌশল ও বাণিজ্যে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য ও এর রাজধানী কনস্টান্টিনোপল গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। এই সম্রাজ্য ১০০০ বছরের ইতিহাসে অনেকবার আশপাশের জাতি ও রাজ্যের অবরোধ আক্রমনের শিকার হয়। এরমধ্যে স্লাভদের (৫৪০, ৫৫৯, ৫৮১) ,পার্সিয়ানদের (৬২৬), আরব মুসলিমদের (৬২৯-৮৭১ এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে), নবম দশম শতকে বুলগেরিয়ান (৮১৩, ৯১৩-১৪) ও রাশিয়ানদের (৮৬০ থেকে ১০৪৩ এর মধ্যে চারবার) আক্রমন উল্লেখযোগ্য। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবদ্দশায় ৬২৯ সালে রোমানদের সাথে যুদ্ধ হয় যা মু’তার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এরপর ৬৩৬ সালে খলিফা উমর (রা) এর সময়ে সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) এর নেতৃত্বে ইয়ারমুক যুদ্ধে বাইজেন্টাইনরা পরাজিত হলে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসরসহ উত্তর আফ্রিকার অনেকাংশ মুসলিমদের অধীনে চলে আসে। 

১০৫৪ সালে গ্রেট শিজমের মাধ্যমে খ্রিস্টান গির্জা রোমান এবং পূর্বভাগে বিভক্ত হলে কনস্টান্টিনোপল ইস্টার্ন অর্থোডক্স গির্জার অধীনে আসে।  এরপর একাদশ শতকের শেষদিকে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের পূর্ব অংশ তুর্কি সেলজুক সুলতানদের দ্বারা বারবার আক্রমনের শিকার হলে সম্রাট প্রথম আলেক্সিস ফ্রান্সের পোপ দ্বিতীয় উর্বানের কাছে সাহায্য চান এবং পোপ উর্বান ১০৯৫ সালে ক্রুসেড যুদ্ধের ঘোষনা দেন। ফ্রান্স, জার্মানি ও ইটালির সম্মিলিত সৈনবাহিনী কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছালে সম্রাট আলেক্সিস তাদের নেতাদের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি নেন যে তুর্কিদের কাছ থেকে পাওয়া জমি তার রাজত্বের অধীনে থাকবে। কিন্তু পশ্চিমা ও বাইজেন্টাইনদের মিলিত বাহিনী তুর্কিদের কাছ থেকে এশিয়া মাইনরের নিকিয়া দখলে নিলেও আলেক্সিস ক্রুসেড সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে আসেন। পরবর্তীতে বাইজেন্টিয়াম ও পশ্চিমাদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে চর্তুথ ক্রুসেডের ঘোষনা আসে এবং ক্যাথলিক ক্রুসেড বাহিনী ১২০৪ সালে কনস্টান্টিনোপল দখল করে ব্যাপক হত্যা, ধবংসযজ্ঞ চালায়। তারা কনস্টান্টিনোপলকে ল্যাটিন রাষ্ট্রে পরিণত করে। তখন শহরের অধিকাংশ জনগন নিকিয়ায় আশ্রয় নেয়। 

 ১২৬১ সালে সম্রাট পঞ্চম মাইকেলের দ্বারা কনস্টান্টিনোপল পুনঃরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও আগের সেই জৌলুস প্রভাব-প্রতিপত্তি হারিয়ে ফেলে। তুর্কি সেলজুক ও উসমানি সুলতানদের কাছে জায়গা হারাতে হারাতে একপর্যায়ে ১৪৫৩ সালে উসমানি খিলাফতের সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের কাছে কনস্টান্টিনোপলের চূড়ান্ত পতন হয় এবং একই সাথে সমাপ্তি ঘটে তৎকালীন সুপার পাওয়ার বাইজেন্টাইন রাজত্বের।  

লেখক- শেখ আশিক মাহফুজ 

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।