বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশে ১৬ হাজার অগ্নি দুর্ঘটনা

চক বাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড । Image Source: bangladeshtoday.net

“বিগত দশ বছরে আমাদের বাংলাদেশে প্রায় ১৬ হাজার অগ্নিকাণ্ড জনিত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রায় ১৫৯০ মানুষ মারা গিয়েছে”; গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ল’ইয়ার সাইয়েদা রেজওয়ানা এমনটাই বলেছেন। তিনি বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট ল’ইয়ার এসোসিয়েশনের চিফ এক্সিকিউটিভ। তিনি গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে আগুন থেকে নিরাপদ থাকার বিষয়ে একটা পাবলিক হিয়ারিং এ এই তথ্য প্রদান করেন।

এমনকি আজ ৩০ মার্চ, শনিবার সকালেই রাজধানীর গুলশান-১ সংলগ্ন ডিএনসিসি মার্কেটের পাশে কাঁচাবাজারে ঘটে যায় আরো একটি ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ২০টি ইউনিট সেখানে আগুন নিভানোর ব্যাপারে কাজ করেছে বলে জানা যায়। ফায়ার সার্ভিসের সাথে গুলশানের এই অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সেনা বাহিনী এবং নৌ বাহিনীর কিছু বিশেষ সদস্যরা যোগ দিয়েছিল। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের এসিস্টেন্ট ডিরেক্টর দেবাশীষ বর্ধন জানান, গুলশান কাঁচা বাজারের ভিতরে একটি হোটেল থেকে এই অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত ঘটে।

এর ঠিক একদিন আগে অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার ঢাকার মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে বনানীতে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। বনানীর সতেরো নাম্বার রোডে বাইশ তলা এফআর টাওয়ারের এই দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস, নৌ বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর তৎপর অগ্নি নির্বাপণ ও পরবর্তী উদ্ধার কাজের পরেও প্রায় ২৫ জন নিহত ও অর্ধ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ভবনটির নবম তলা থেকে এই অগ্নিকান্ডের উৎপত্তি ঘটেছিল বলে জানা যায়। তবে এই আগুন লাগার পরে দেখা গেছে সেখানের জরুরী নির্গমন রাস্তাটি ছিল বন্ধ। এ কারণে উদ্ধার কাজেও প্রচুর দেরী হয়েছিল। এছাড়া গণপূর্ত মন্ত্রী বলেন, ভবনটির মালিক মূল নকশা না মেনেই নির্মাণ করেছিলেন এই এফআর টাওয়ার।

এই ২০১৯ সালেই আরো একটি ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটেছিল। খুব বেশী দিন আগে নয়,  গত মাসে ফেব্রুয়ারির বিশ তারিখে ঢাকার চকবাজার সংলগ্ন এলাকায় একটি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে দ্রুত আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পরে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের নিরলস প্রচেষ্টায় পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসলেও সরকারি হিসাব মতে চকবাজারের এই অগ্নিকান্ডে ৭৮ জন মানুষ মারা যায়।

চকবাজারের এই দুর্ঘটনা সেদিন বিবিসিতে শিরোনাম হয়েছিল। বিবিসিতে আরো বলা হয়েছিল, ২০১০ সালেও অগ্নি দুর্ঘটনায় নিমতলীতে প্রায় ১২৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্ত সেই অগ্নিকান্ডের পরেও সরকার থেকে কোন ধরনের পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। বিবিসিতে বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থার নিন্দা জানিয়ে বলা হয়েছিল, “বাংলাদেশের বড় ধরনের ভবনগুলোতে আগুন লাগলে প্রচুর মানুষ হতাহত হবে এমনটাই স্বাভাবিক। কেননা কর্তৃপক্ষের উদাসীন মনোভাবের কারণেই ফায়ার সার্ভিসের সেফটি রুলস না মেনেই এবং অন্যান্য আরো অনেক নিয়ম না মেনেই নির্মাণ করা হয় ভবনগুলো”। চকবাজারে দুর্ঘটনার ঠিক পরের দিনই আবার মিরপুরের ভাসান-টেক থানার অন্তর্গত জাহাঙ্গীর বস্তীতে আগুন লেগে পুড়ে গিয়েছিল প্রায় ১৫০টির উপর ঘর। তবে সেখানে কোন হতাহত’র খবর পাওয়া যায় নি।

২০১০ সালে নিমতলীতে একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হলে, সেখান থেকে খুব দ্রুতই আশেপাশের ভবনগুলোতে আগুন লেগে যায়। আগুন খুব বেশিই দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশে, তার কারণ হল আশেপাশের প্রায় সবগুলো দোকানেই অসংরক্ষিত এবং অনিরাপদ উপায়ে রাখা হয়েছিল অনেক রাসায়নিক কেমিক্যালই। আর এগুলোর মধ্যে অনেকগুলো কেমিক্যালই ছিল দাহ্য এবং ফলাফল স্বরূপ এগুলোর সংস্পর্শে এসে চারপাশে আরো দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দুর্ঘটনায় আশেপাশে অনেকগুলো ভবনে প্রচুর পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং প্রায় ১১৭ জন মানুষ নিহত হয় ও ১০০’র উপর মানুষ আহত হয়েছিল বলে খবর পাওয়া গেছে।

২০০৬ সালের পর বাংলাদেশে প্রায় ছয়শ শ্রমিক অগ্নিকান্ডে মারা গেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল আল-জাজিরা টিভি চ্যানেলে। এছাড়া ২০১২ সালের তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডের কারখানায় ২৪শে নভেম্বর একটি ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে প্রায় একশ সতের জন শ্রমিক পুড়ে মারা যায় ও প্রায় দুই-শতাধিক মানুষ আহত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে কারখানায় আগুন লাগার মধ্যে এটিই সবচাইতে ভয়াবহ বলে গণ্য করা হয়। এই কারখানায় আগুন লাগে শনিবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে এবং আগুন নিভানো সম্ভব হয়েছিল পরদিন রোববার ভোর ছয়টার দিকে। ইতোমধ্যেই আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন শতাধিক শ্রমিক।

পরবর্তীতে ২০১৬ সালেই টঙ্গীতে অবস্থিত একটি সিগারেটের কারখানায় বিস্ফোরণের কারণে আগুন লেগে প্রায় ২৫ জন নিহত হয়েছিল। এমন সময় পাঁচতলা সেই ভবনটির উপরের তিনতলা আগুনের কারণে ধ্বসে যায়। একই সালে গাজীপুরের পুবাইল এলাকায় একটি কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের কারণে আগুন ধরে যাওয়ার পর সেখানে পাঁচজন নিহত ও প্রায় দশজন আহত হয়েছিল বলে জানা যায়।

বাংলাদেশে একের পর এক অগ্নিকান্ড ও হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণের দিকে লক্ষ্য করিয়ে পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, একসময় বাংলাদেশ অনেক গরীব একটি দেশ ছিল এবং আর কয়টা গরীব দেশে অবকাঠামো যেভাবে অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নির্মাণ হয় বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি”।

ফায়ার সার্ভিসের দেয়া তথ্যমতে ঢাকায় প্রায় এগারো হাজার বহুতল ভবন এই ধরনের অগ্নিকান্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ধরনের সকল ভবনের ফায়ার সার্ভিস থেকে কোন ধরনের ছাড়পত্র নেই এমনকি আগুন নেভানোর কোন পরিকল্পনাও (ফায়ার সেফটি প্ল্যান) নেই।

এ সম্পর্কে গণপূর্ত মন্ত্রী রেজাউল করিম বলেছেন, আগামী পনের দিনের মধ্যেই চিহ্নিত করা হবে কোন কোন ভবন এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তিনি আরো বলেন, এই ব্যাপারে আর কাউকে কোন ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। সরকার কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

লেখক- Iqbal Mahmud

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

সর্বাধিক পঠিত