১০ জনের মধ্যে ৯ জন পোশাক শ্রমিকেরই তিন বেলা খাওয়ার সামর্থ্য নেই

বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা ভালোভাবে জীবন ধারণ করার জন্য যে ন্যূনতম মজুরি দরকার তা থেকে বঞ্চিত; Image Source: 2ser.com

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা এগিয়ে যাচ্ছে, এতে দ্বিমত করার সাহস কেউ হয়ত করবে না। গত ৪ এপ্রিল প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির পক্ষেই গান গাইছে। সেই প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি। সেই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বাংলাদেশের বাড়ন্ত অর্থনীতির মূলে রয়েছে আমাদের স্বল্প বেতন পাওয়া গার্মেন্টস শ্রমিক, রোদে পোড়া  নির্মাণ শ্রমিক, ফসলের ঠিক মতো দাম না পাওয়া কৃষক এবং নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো প্রবাসীরা।

আমাদের অর্থনীতির পরিধি দ্রুত বাড়ছে এটা নিয়ে আমাদের আনন্দিত হবার যেমন কারণ আছে ঠিক তেমনি আমাদের এই অর্থনীতি নির্মাণের পেছনে যেসব মানুষের অবদান তাদের খোঁজ খবর রাখাও আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পরে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যে কয়টি পিলারের ওপর আজ দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেয় তৈরি পোশাকশিল্প। ১০ বছর আগে পোশাক রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হতো ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। এখন পোশাক শিল্প খাতের রপ্তানি আয় ৩ গুণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার।

পোশাকশিল্পের উন্নতির গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও পোশাক শ্রমিকদের জীবনমানের দৈন্যদশা চোখে পড়ার মতো। পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি আগে ছিল ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে মজুরি বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা এবং ২০১৫ সালে আরেকবার বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করা হয়। গত দুই বছরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গঠিত মজুরি বোর্ড বেশ কয়েকটি শিল্প খাতের নতুন মজুরি নির্ধারণ করে। সে হিসেবে এখন পোশাক শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন মাসিক মোট মজুরি ৮ হাজার টাকা। কিন্তু এই টাকা যে তাদের জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট নয় তা বিভিন্ন সময়ে  বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা ও জরিপে উঠে আসছে।

আরেকদফা মজুরি বাড়ানোর পরেও এখনো বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা বিশ্বের সবচেয়ে কম মজুরি পাওয়া শ্রমিক। জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের একটি সার্ভে অনুযায়ী বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের গড় মাসিক বেতন যেখানে ১০১ ডলার, সেখানে মিয়ানমারের শ্রমিকদের গড় মাসিক বেতন ১৩৫ ডলার, কম্বোডিয়ার শ্রমিকদের ১৭০ ডলার, ভিয়েতনামের শ্রমিকদের ২৩৪ ডলার এবং চায়নার শ্রমিকদের ৫১৮ ডলার।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তাদের একটি গবেষণায় দেখিয়েছে যে ঢাকার আশেপাশের শহরগুলোতে যেমন সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত ১৩ হাজার ৬৩০ টাকা আর ঢাকার মধ্যে ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত ১৬ হাজার ৪৬০ টাকা যা বর্তমান মজুরির দ্বিগুণ। মাঠ পর্যায়ে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এলাকার বাসা ভাড়া, পানির ব্যবস্থা, নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের মূল্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, পরিবহণ খরচ হিসেব করে আইএলও এই ন্যূনতম মজুরির কাঠামো নির্ধারণ করে।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমই- এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। এর মধ্যে ২৬ লাখ অর্থাৎ ৬৫ শতাংশই নারী। ঢাকা ও ময়মনসিংহের চারটি কারখানায় ২ হাজার ৬০০ নারী শ্রমিকের ওপর গবেষণা চালায় আইসিডিডিআর,বি। তাদের গবেষণায় দেখা যায় নারী পোশাক শ্রমিকদের ৮০ শতাংশই রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।

বিশ্বে দারিদ্রতা দূরীকরণে কাজ করা অস্ট্রেলিয়ান প্রতিষ্ঠান অক্সফাম বাংলাদেশের দেড় হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে জরিপ চালিয়ে একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাদের সেই গবেষণার তথ্য উপাত্তগুলো রীতিমতো চমকে দেবার মতো। অক্সফামের রিপোর্ট হিসেবে ওভারটাইম করার পরও বাংলাদেশের প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯৮ জন পোশাক শ্রমিকই কোনো রকমে বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছে না। শতকরা ৮৭ ভাগ পোশাক শ্রমিকেরই মাস শেষ হবার আগেই টাকা ধার করে চলতে হয়। শতকরা ৫৬ ভাগ পোশাক শ্রমিকের বাকিতে দোকান থেকে কেনাকাটা করতে হয়।

তিন বেলা খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাটাই যেখানে দায় সেখানে মাছ, মাংস কিনে খাওয়া বেশিরভাগ পোশাক শ্রমিকদের কাছে বিলাসিতার ব্যাপার। অক্সফামের হিসেব মতে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯১ জন পোশাক শ্রমিকই তাদের নিজেদের এবং পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারের জোগান দিতে পারে না। সম্প্রতি নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমই এবং নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল (এনআই) এ শিল্পে কর্মরত প্রায় দুই লাখ নারী শ্রমিককে আয়রন ট্যাবলেট সরবরাহ করার একটি উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশের শতকরা ৯৯ ভাগ পোশাক শ্রমিকই নিয়মিত ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কাজ করে। শতকরা ৫৫ ভাগ শ্রমিকই নিয়মিত ৩ ঘণ্টার বেশি সময় অতিরিক্ত কাজ করে। চাকরি চলে যেতে পারে এই ভয়ে অনেক শ্রমিকই অতিরিক্ত কাজের নির্দেশ আসলে সেটা অগ্রাহ্য করতে পারে না। এমনকি শতকরা ৭৭ ভাগ শ্রমিক অসুস্থতা নিয়েও কাজ করে যায়। একে খাদ্যে আমিষ এবং আয়রনের অভাব, সেই সাথে ওভারটাইমের বোঝা শারীরিক এবং মানসিকভাবে পোশাক শ্রমিকদের অসুস্থ ও অবসাদগ্রস্থ করে ফেলে। বিরতিহীনভাবে কাজ করতে বাধ্য হওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে পিঠ ব্যথা, মেরুদণ্ডে ব্যথা , মূত্রনালির সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন পোশাক শ্রমিকরা।

পোশাক উৎপাদন থেকে আয়ের অধিকাংশই পায় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কারখানা পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীরা। শ্রমিকের প্রাপ্তির খাতায় কেবল দুঃখ কষ্টই যেন লেখা। বাংলাদেশের প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ পোশাক শ্রমিক ১৮ বছরের আগেই গার্মেন্টসে কাজ করা শুরু করে। বাবা-মার অভাবের সংসারে পড়ালেখা করার সৌভাগ্য তাদের হয়না। ফলে অন্য কোনো কাজে দক্ষতা অর্জন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তাদের হাতে তেমন কোনো বিকল্প না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা এত কম বেতনে গার্মেন্টসে চাকরি করছে এবং মুখ বুজে সব বঞ্চনা সহ্য করে যাচ্ছে।

লেখক- হাসান উজ জামান   

আরও পড়ুন – বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কেন এত আকর্ষণীয়? 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

সর্বাধিক পঠিত