‘নিউইয়র্ক আর আমার বাংলা মা’

নিউইয়র্কে যারা প্রথম আসেন তাদের জন্য এ নিশ্চই এক অন্যরকম অনুভুতি হওয়ার কথা, যে সাবওয়ে ট্রেনে বাংলায় বিজ্ঞাপন আর প্রচারনা চালানো হচ্ছে সরকারী উদ্যোগে!
১৭ নভেম্বরের ব্যস্থ সকাল বেলা। যাব ম্যানহাটান। গাড়ি নিয়ে যাব নাকি, ট্রেনে যাব এই দ্বিধায় কাটল অনেকটা সময়।শীতের সকালে গাড়টা চালিয়ে গেলে ঠান্ডা বাতাস থেকেও মুক্তি মিলবে একদিকে। অন্যদিকে, দুটি ভারী ব্যাগ আছে আমার কাধে, সেগুলি সযতনে রাখা যাবে গাড়ির পেছনের বিশাল ফাকা জায়গায়। কিন্তু বিপত্তি ও তো আবার আছে, তাই না? ম্যানহাটান যেতে আসতে গাড়ির টোল লাগবে কমপক্ষে ১২ ডলার। সকালের নাস্তা আরো ৫ ডলার। সব মিলিয়ে এই ১৭ ডলার খরচ হলেও তো কথা থাকতো না? গাড়ি টা রাখার জায়গা পাব কোথায়? ম্যানহাটান এ পার্কিং এ যা হাল! প্রাইভেট পার্কিং এ নির্ঘাত ৪০/৫০ ডলার খরচ হয়ে যাবে ঘন্টা তিনেক এর জন্য। না হলে, ভুল জায়গায় পার্কিং করলেই তো পুলিশের টিকেট, সাথে গাড়ি ‘টো’ করে নিয়ে গেলে তো ৩০০ ডলারের মামলা! দরকার নেই বাবা, সিদ্ধান্ত নিলাম ট্রেনেই যাব। ভাগ্যিস ট্রেনে উঠলাম অনেক দিন পর, নাহলে কি এমন মধুর একটি দৃশ্য আমি দেখতে পেতাম?

কুইন্স এর রিচমন্ড হিল থেকে বাস যোগে কিউ গার্ডেন থেকে উঠেছি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার গামী ই -ট্রেন এ। বেশ অনেক দিন পরই বলা চলে পাতাল ট্রেনে উঠলাম। বসার জায়গা না পেয়ে দাড়িয়েই আছি আর মানুষ দেখছি।নানা রঙের মানুষ। কালো মানুষ, সাদা মানুষ, বৃদ্ধ মানুষ, কম পোষাকী তরুনী যার যার জগৎ আর ভাবনা নিয়েই ব্যস্থ। এর মধ্যে আমার চোখ আটকে গেল সাবওয়ে ট্রেনের ভিতরে নিউইয়র্ক শিক্ষা দপ্তরের একটি পোস্টার-এ। পরিষ্কার বাংলায় লেখা, ‘নিউইয়র্ক পাবলিক স্কুল গুলি বাংলা বলে’।

নিউইয়র্কে যারা প্রথম আসেন তাদের জন্য এ নিশ্চই এক অন্যরকম অনুভুতি হওয়ার কথা, যে সাবওয়ে ট্রেনে বাংলায় বিজ্ঞাপন আর প্রচারনা চালানো হচ্ছে সরকারী উদ্যোগে! দুবছর এই শহরের রাস্তায়, মাঠে ঘাটে কাটিয়ে দেওয়ার পরও আমার সেরকম-ই একটি অনুভুতি হলো। ওহ আমার বাংলা মা! কি যে ভাললাগা! এই ভিন দেশে, ভিন শহরের ব্যস্থ জনমানুষ দেখছে বাংলার অক্ষর! আমার বাংলা ভাষা!

এর আগে কি কখনও দেখেছি পাবলিক ট্রেনে এমন বাংলা ভাষা? দেখেছি নিশ্চই জ্যাকসান হাইটস এ, বা ভোটের দিন ভোট কেন্দ্রে ঢোকার আগে ৬/৮ টি ভাষার পোষ্টার, সেখানে বাংলাও থাকে। তবে, সেটি বহুল বসবাসরত বাংলাদেশী এলাকা যেমন, জ্যাকসান হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রঙ্কস এর পার্কচেষ্টার এ দেখা মেলে। তাই বলে,প্রায় ৮৫ লক্ষ মানুষের আ্বাস যেই ব্যবস্থ শহরে, সেই শহরের এমন ব্যস্থ পথে বাংলায় পোস্টার। কতই না সংখ্যায় আমরা বেড়ে চলেছি, এই সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ে! মনে মনে ভাবলাম, একটা ছবি তুলতে হবে, পরে যদি আর কখনও না দেখি। কিন্তু ছবি তোলা তো একবারে সাধারন কথা নয়, কতগুলো মানুষের অনুমতি নেয়া দরকার, যেন তারা কিছু না বলে। অনেক ক্ষন ভাবলাম।

পাতাল ট্রেন চলছে, ফরেস্ট হিল থেকে জ্যাকসান হাইটস, কোর্ট স্কয়ার, লেক্সিনটন এভিনিউ। আমি নামবো ৩৪ পেন স্টেশন এ। আর ৩ টি স্টেশন বাকী। ছবি কি তুলতে পারবো না? এমন ভাল লাগার স্মৃতি কি সাথে নিতে পারবো না? ভারী দুটি বাগ এক জায়গার রেখে এগিয়ে গেলাম ভীড়ের মধ্যে। ছবিটা যেখানে সাটানো সেখানে গাদাগাদি করে বসে অনেক জন, আবার দাড়িয়েও অনেকজন।আমার হাতে ক্যামেরা আর অন্যদৃষ্টি দেখে দু একজন সরে দাড়ালো দেখলাম।ভয় পেল কিনা জানিনা, তবে কিছু বলার আগে অনুনয় করলাম, একটা ছবি তুলি প্লিজ?

নিউইয়র্কে যারা প্রথম আসেন তাদের জন্য এ নিশ্চই এক অন্যরকম অনুভুতি হওয়ার কথা, যে সাবওয়ে ট্রেনে বাংলায় বিজ্ঞাপন আর প্রচারনা চালানো হচ্ছে সরকারী উদ্যোগে!


-আমার? আমাদের?

দুজন মানুষ আমাকে বিষ্ময়ে প্রশ্ন করলো।

-না, এই পোস্টার টার।

-ওহ তাই বলো। নিশ্চই!

আমি ছবি তুলে ফেললাম একটি দুটি তিনটি। মুচকি হেসে বিষ্ময় নিয়ে একজন প্রশ্ন করলো, কি লেখা এখানে? আমি কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে দিলাম।

-তেমন কিছু না, এটা আমার বাংলা মা।আমার মায়ের ভাষা। ভাল লাগলো, তাই যত্ন করে স্মৃতিতে রাখলাম।

হাসলো তারা দুজনই। আমিও হেসে দিয়ে চলে এলাম আমার নিজের দাড়ানো জায়াগায়। ছবি গুলো কেমন হয়েছে, সেটা দেখলাম। আবারও হাসলাম। কেননা, ছবি আমি তুলেছি ৩ টি ঠিকই, কিন্তু তিন-টিই উঠেছে একই ফ্রেমে।যার যোগফল আসলে, একটিই ছবি। যাকগে, কম কিসে, যা চেয়েছি তা তো পেয়েছি-ই।নিজেকে নিজেই বললাম। আর ভাবলাম, সত্যিই তো, এই শহর এক আজব শহর। পৃথীবির এমন কোন জাতিগোষ্টী নেই, যার দুই কিংবা ১০ জন মানুষ নেই এই শহরে। ৮৫ লক্ষ মানুষ হলে, অন্তত ৫ হাজার ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ব্যাবহার করেন তারা। এর মধ্যে সরকারী উদ্যোগে সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলোকেই টার্গেট করে, বিভিন্ন কমিউনিটির কাছে পৌছানোর চেষ্টা করা হয়। বাংলাভাষা বেশ অনেকদিন আগে থেকেই সে তালিকায়। সেজন্যেই তো বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা বলছে, পাবলিক স্কুলগুলি বাংলাও বলে!

যদিও লাভ খুবই কম। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, নিউইয়র্কের সর্বচ্চ বৃদ্ধি পাওয়া জনগোষ্টীর একটি বাংলাভাষা ভাষী জনগোষ্টী। আর নিউইয়র্ক পাবলিক স্কুল নয় শুধু, এখানকার বিষেশায়িত মেধাবিদের স্কুল গুলোতে প্রতিবছর যত ছাত্রছাত্রী ভর্তির যোগ্য হয়, তার ১০ শতাংশই বাংলাদেশী পরিবার গুলি থেকে যাচ্ছে। এ এক বিরল, অগ্রযাত্রা। তবে, তারা পড়াশুনায় এগিয়ে গেলে্‌ও, ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে বাবা-মায়ের সংস্কৃতি থেকে। এ প্রজন্মের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা, বাংলা বলতেই চায় না। শিখেই না এত চেষ্টার পরও।

সেখানে স্কুলগুলিতে তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের বিধান করেছে নিউইয়র্ক। সরকারী সেবাদান কেন্দ্রে কেউ ফোন দিলে, সেখানে বাংলায় কথা বলার মানুষ আছে আ্লাদা। হাসপাতাল গুলিতে রোগী ভর্তি হলে, তার সমস্যার কথা তারা বাংলাতেই বলতে পারেন, ওপর প্রান্ত থেকে ডাক্তারকে সেটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেয়ার লোকও আছে। নির্বাচনের সময় বাংলায় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারনা, ভোট কেন্দ্রের নিয়ম নীতিমালা বাংলায় লেখা থাকে।এমন শহর নিশ্চই আরো আছে বাংলার বাইরে, এই ভুবনে! কি আছে কি? আমার বোধ হয় জানা নেই। তবে, নিউইয়র্কে বাংলা আর বাংলায় কথা বলার মানুষের অভাব নেই। এ যেন আটলান্টিকের এপারে এক বাংলা মায়ের স্বর্গও।

সাহেদ আলম
প্রথম আলো- ২৪ নভেম্বর, ২০১৭ এ পকাশিত

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

সর্বাধিক পঠিত