featured বিশ্ব

‘দ্য বে অব পিগস ইনভেশন’ : পিগ উপসাগর আক্রমণ1 min read

জুলাই ১৪, ২০১৯ 4 min read

author:

‘দ্য বে অব পিগস ইনভেশন’ : পিগ উপসাগর আক্রমণ1 min read

Reading Time: 4 minutes

১৯৫৯ সালের প্রথম দিনে কিউবার তরুণ জাতীয়তাবাদী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো রাজধানী হাভানায় একটি গেরিলা হামলা চালান। এর উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার মদদপুষ্ট কিউবার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফুলজেনসিও বাতিস্তার (১৯০১-১৯৭৩) পতন। পরবর্তী দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) মিলে কাস্ত্রোকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা চালায়। অবশেষে ১৯৬১ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা সিআইএ-কে কিউবা আক্রমণের  আদেশ দেয়।

কিউবা ও আমেরিকার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সূত্রপাত

১৯৫৯ সালে স্বৈরশাসক বাতিস্তাকে সরিয়ে ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতাগ্রহণ করলে অনেক কিউবান নাগরিকই তাঁকে সমর্থন জানায়। ফলে দ্বীপরাষ্ট্র কিউবাতে চালু হয় নতুন ধারার শাসন ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র ১০০ মাইল দূরে প্রতিষ্ঠিত হয় এক নতুন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। এটা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে চিন্তায় ফেলে দেয়। ফুলজেনসিও বাতিস্তা যদিও বা একজন দুর্নীতিবাজ স্বৈরশাসক ছিলেন তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাঁর ছিল দহরম-মহরম সম্পর্ক। তখন আমেরিকার কোম্পানিগুলো কিউবায় নির্বিঘ্নে বাণিজ্য করত। শুধু তাই নয়, তখন আমেরিকার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ও সম্পদশালী মার্কিনেরা কিউবার চিনি সম্পদ, প্রচুর গবাদি পশু, আকর এবং খনিজ সম্পদ দখল করে ছিল। বাতিস্তা এসব ক্ষেত্রে মার্কিনদের কোন ধরণের বাঁধা দেন নি বললেই চলে। তার উপরে বাতিস্তা ছিলেন একজন সমাজপ্রথা বিরোধী শাসক।

আমেরিকার এই সমস্ত অনৈতিক দখলদারীত্বে ফিদেল কাস্ত্রো এসে জল ঢেলে দেন। তিনি কিউবায় আমেরিকানদের অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্যে সরাসরি বাঁধা প্রদান করেন। তিনি কিউবার সাধারণ জনগোষ্ঠীকে নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে তুলতে শুরু করেন। তিনি বোঝাতে লাগলেন, এখনই সময় রুখে দাঁড়ানোর। তখন ফিদেল কাস্ত্রোর জনপ্রিয় শ্লোগানগুলোর মধ্যে একটি ছিল ” কিউবা ইয়েস! ইয়ানকিস নো!” শুনলে অবাক হবেন যে, আমেরিকা ফিদেল কাস্ত্রোর শাসন ব্যবস্থা নিয়ে এতটাই শংকিত ছিল যে তাদের গুপ্তচর দিয়ে কাস্ত্রোকে হত্যার পরিকল্পনা পর্যন্ত করেছিল বেশ কয়েকবার।

কাস্ত্রো ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে কিউবার উপর থেকে আমেরিকার কর্তৃত্ব কমাতে আরম্ভ করে। তিনি আমেরিকা-প্রধান শিল্প কারখানাগুলো যেমন— চিনি শিল্প, বিভিন্ন খনিজ শিল্প প্রভৃতিকে জাতীয়করণ করেন। নতুন করে ভূমি আইন প্রণয়ন করেন। এসব দেখে যুক্তরাষ্ট্রের ততকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার সিআইএ-কে নিয়ে এক ফন্দি আঁটেন। তিনি সিআইএ কে নির্দেশ দেন, কিউবার যে ১৪০০ নির্বাসিত লোক আছে তাদের যেন মিয়ামিতে থাকতে দেওয়া হয় এবং কাস্ত্রোকে হটানোর জন্য তাদেরকে যেন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ যেন কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা!

১৯৬০ সালের মে মাসে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের চিরশত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। যুক্তরাষ্ট্রও এর পাল্টা জবাবে কিউবা থেকে চিনি আমদানি বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র কিউবা থেকে যে পরিমাণ চিনি আমদানি করত তা ছিল কিউবার মোট অর্থনীতির আশি শতাংশ। তাই কিউবার অর্থনীতি যেন কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবার কাছ থেকে চিনি কিনতে সম্মত হয়।

১৯৬১ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং গোপনে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে আমেরিকান রাজনীতিবিদ ও উপদেষ্টারা যুদ্ধ না করার পরামর্শ দেন। তারা বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটা পরাশক্তির দেশ কিউবার মতো একটা টিকটিকিকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কি আছে। কিন্তু দূরদর্শী কেনেডি বললেন, তিনি কিউবাকে নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন। কিন্তু কিউবাকে সামনে রেখে পেছন থেকে যারা ইন্দন জোগাচ্ছে যেমন— চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য কমিউনিস্ট রাষ্ট্র তাদেরকে মোটেও খর্ব করে দেখা যাবে না। তাই স্নায়ুযুদ্ধ হবে এবং সে যুদ্ধে জিততেই হবে।

যুদ্ধের নীল নকশা

জন এফ কেনেডি লক্ষ্য করলেন, সিআইএ কিউবা থেকে পালিয়ে আসা ১৪০০ কিউবানকে বেশ ভালোভাবেই গেরিলা হামলার জন্য প্রস্তুত করেছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট কেনেডি যেন ঠিক ভরসা পাচ্ছিলেন না। কারণ তিনি প্রস্তুতিতে কোন ফাঁকফোকর রাখতে চান না। তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সরাসরি আক্রমণের নির্দেশ দেন। এদিকে রাশিয়া যুদ্ধের কিছুটা আভাস পেয়ে কিউবাকে সতর্ক করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে সিআইএ আশ্বস্ত করে যে, কাস্ত্রো-বিরোধীরাই প্রথমে আক্রমণ শুরু করবে।

যুদ্ধাবস্থার একটি মুহূর্ত

পরিকল্পনার বাস্তবায়ন

পরিকল্পনার প্রথম অংশ ছিল কিউবার দূর্বল বিমানবাহিনীকে এমনভাবে ধ্বংস করে ফেলা যাতে, পালটা আক্রমণের আর কোন সুযোগ না পায়। ১৯৬১ সালের এপ্রিলের ১৫ তারিখে একদল নির্বাসিত কিউবান নিকারাগুয়া থেকে B-26 নামের একটি বোমারু বিমান নিয়ে কিউবায় আসে। বিমানটি কিউবার চুরি হওয়া বিমানের মতো রং করা ছিল। যাতে করে কিউবার বিমানবাহিনী দেখে সহজে বুঝতে না পারে যে, এটা বাইরের বিমান। ওরা এসেই প্রথমে কিউবার বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্যবশত কাস্ত্রো এবং তাঁর উপদেষ্টারা এ হমলার ব্যাপারে আগে থেকে টের পেয়েছিলেন। তাই হামলা শুরুর আগেই বিমানগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলা হয়। প্রথম পরিকল্পনায় ব্যর্থ কেনেডি যতটা সহজ ভেবেছিলেন কিউবাকে হারানো আসলে ততটা সহজ ছিল না।

দুই দিন পর মানে ১৭ এপ্রিল কিউবার নির্বাসিত সৈন্যরা দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলে ‘বে অব পিগ’নামক স্থানে আক্রমণ করে। হঠাৎ করে এই হামলা দ্বীপে একটা আকস্মিক দুর্যোগের রূপ নেয়। সিআইএ চেয়েছিল এ ঘটনা যতটুকু সম্ভব গোপন রাখতে। কিন্তু তারা জানত না যে, সৈকতে একটি রেডিও স্টেশন রয়েছে। সেটি ঐ ধ্বংসাত্মক ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা সমগ্র কিউবাজুড়ে প্রচার করে। আবার অপ্রত্যাশিতভাবে সাগরের কোরাল রিফ এর ধাক্কায় আক্রমণকারীদের জাহাজগুলোও ডুবে গিয়েছিল। আর প্যারাশুটধারী সৈন্যদল বিমান থেকে ভুল স্থানে অবতরণ করে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ছিল। এদিকে কিউবার সামরিক বাহিনী ঠিকসময়ে স্পটে হাজির হয়ে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করে। ২৪ ঘন্টারও কম সময় স্থায়ী হওয়া এ যুদ্ধে ১১৪ জন নিহত হয় এবং প্রায় ১১০০ জনকে আটক করা হয়।

যুদ্ধের পর আটক হওয়া বিদ্রোহীরা

যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি

অনেক ইতিহাসবিদদের মতে, কিউবা যুদ্ধে সিআইএ এবং নির্বাসিত সৈন্যের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট কেনেডি আমেরিকান সামরিক বাহিনীও প্রেরণ করেছিলেন। তিনি কঠোরভাবে বললেন যে, কিউবাতে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হোক তা তিনি কোনভাবেই চান না। আর এটাও বলেছেন যে, তিনি চান না পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হোক। তাঁর এ বক্তব্যের পর তিনি আর কিউবার সাথে যুদ্ধে জড়ান নি। ১৯৬২ সালে কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র সংকট আবার আমেরিকা-কিউবা-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে।

লেখক- নিশাত সুলতানা  

আরও পড়ুন- আমেরিকা-কিউবার সরল গরল সম্পর্ক

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *