জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ভাগ্যে কি অপেক্ষা করছে?

উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার অনেকেই; Image Source: gnuckx, Flickr

বিশ্বের সকল গণমাধ্যমে আবারও আলোচনায় উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ইকুয়েডর অ্যাসেঞ্জের রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিল করলে গত ১১ এপ্রিল, ২০১৯ লণ্ডনে অবস্থিত ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করে লণ্ডন পুলিশ। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে অবস্থান কালে অ্যাসাঞ্জ বারবার শর্ত ভঙ্গ করেছেন এবং গুপ্তচরবৃত্তির চেষ্টা করেছেন অভিযোগ এনে ইকুয়েডর তার আশ্রয় বাতিল করে।

ইকুয়েডরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদপত্র গার্ডিয়ানকে বলেছেন “আমরা আমাদের ঘরকে, যে ঘরের দরজা খোলা ছিল, তাকে গুপ্তচরবৃত্তির কেন্দ্রে পরিণত হতে দিতে পারি না”।

কিন্ত উইকিলিকস কর্তৃপক্ষের দাবী “এইএনএ পেপারস” নামের গোপনীয় নথি ফাঁস করার ফলে জানাজানি হয়ে গেছে যে ইকুয়েডরের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকারী এক চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোরেনোর পরিবারের সদস্যরা ঘুষ নিয়েছেন। এর রেশ ধরে তিনি জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ওপর ক্ষিপ্ত। যদিও কিছু সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে ঋণ বা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য মোরেনো অ্যাসাঞ্জের আশ্রয় বাতিল করেছেন।

ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে অ্যাসাঞ্জকে টেনে হিঁচড়ে বের করছে লন্ডন পুলিশ; Image Source: The Guardian

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বর্তমান অবস্থা ভালোভাবে বুঝতে হলে আগে তার কর্ম এবং তার সাথে ঘটা সব ঘটনাগুলোর প্রবাহ জানতে হবে। তা নাহলে অনেক কিছুই ধোঁয়াশা থেকে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

কীভাবে আলোচনায় এসেছিলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ?

প্রথাগত সাংবাদিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ সাংবাদিকতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেন। শক্তিশালী রাষ্ট্র, সরকার, ক্ষমতাধর ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সাধারণ জনগণকে অন্ধকারে রেখে তাদের নিজেরদের স্বার্থ  উদ্ধার করে। পর্দার আড়ালে কি হয় সেটা সাধারণ মানুষের অগোচরে থেকে যায়। কিন্ত লাখ লাখ গোপনীয় নথি ফাঁস করে সবার সামনে তাদের বিবস্ত্র করার দুঃসাহসিক কাজটি করেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ।

লাখ লাখ মার্কিন গোপন নথি ফাঁস করে তিনি বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেন। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর কুকর্ম ও নৃশংসতার খবর তিনি নগ্নভাবে তুলে ধরেন বিশ্ববাসীর সামনে। তিনি আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীর অন্যায়-অপকর্মের প্রমাণস্বরূপ ভিডিও চিত্রসহ কয়েক লাখ গোপনীয় সামরিক নথি উইকিলিকস ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেন।

শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, আরও বেশ কিছু রাষ্ট্রের কুকীর্তি উইকিলিকসের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন অ্যাসাঞ্জ। তার বিরুদ্ধে অনেক রাষ্ট্রের তোডজোড় দেখলেই বোঝা যায় তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারকে তীব্রভাবে ঝাঁকুনি দিতে পেরেছিলেন। সেসব শক্তিশালী রাষ্ট্র ও সরকার যে জবাবদিহির বাইরে নয় সেটিও বিশ্ববাসীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ।

বন্দী জীবনের শুরু যেভাবে 

২০১০ সালে সুইডেনে দুই নারী অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। মামলার তদন্ত যখন শুরু হয় তখন তিনি লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। সুইডিশ প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষ অ্যাসাঞ্জকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুইডেনে হাজিরা দিতে বলেন, কিন্ত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লন্ডন থেকে স্টকহোমে গেলে, সুইডিশ কর্তৃপক্ষ তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি সুইডেন যাননি। যদিও অ্যাসেঞ্জ সুইডিশ প্রশিকিউশনকে বলেছিলেন লন্ডনে এসে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে কিন্ত এ প্রস্তাবে আবার সুইডিশ প্রসিকিউটররা রাজি হননি।

যুক্তরাজ্য অ্যাসেঞ্জের বসবাসের অনুমতি বাতিল করে সুইডেনের যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগে, তথ্য ফাঁস করার অভিযোগে নয়। অ্যাসেঞ্জ ব্রিটিশ পুলিশের কাছে হাজিরা দিতে গিয়ে প্রথম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যদিও কয়েকদিন জেল খাটার পর ব্রিটেনের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তির সহযোগিতায় তিনি জামিনে মুক্তি পান। অ্যাসাঞ্জ তার জামিনদারদের অন্যতম ভগান স্মিথ নামের এক অভিজাত ব্যক্তির বাসায় নজরবন্দী ছিলেন। তবে জামিন শেষ হবার ঠিক আগ মুহূর্তে ২০১২ সালের জুন মাসে তিনি ইকুয়েডরের দূতাবাসে আশ্রয় নেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আদালতের জামিন লঙ্ঘনের জন্য তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করে।

অ্যাসাঞ্জ ইকুয়েডর সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেন। ইকুয়েডরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়ার সঙ্গে অ্যাসাঞ্জের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক থাকায় তিনি সহজেই ইকুয়েডরের রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে যান। সর্বশেষ ১১ এপ্রিল জামিন লঙ্ঘনের দায়ে গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত প্রায় ৭ বছর তিনি লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে অবস্থান করছিলেন এবং সেখান থেকেই তিনি তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচন

২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার গোয়েন্দাদের পাশাপাশি জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জের নামও আসে। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল কাউন্সেলর রবার্ট ম্যুলার অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বারের কাছে মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ বিষয়ে ৩০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেন।

নিউইয়র্ক টাইমস এর তথ্য অনুযায়ী রবার্ট ম্যুলারের প্রতিবেদনে ১২  জন শীর্ষস্থানীয় রুশ সামরিক গোয়েন্দার ছবির পাশে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ছবিও প্রকাশ করা হয়। রাশিয়ার শীর্ষ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করে হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচারণা দলের চেয়ারম্যানের ই-মেইলসহ ডেমোক্রেটিক পার্টির বিভিন্ন সংগঠনের কয়েক লাখ মেইল চুরি করে উইকিলিকসের মাধ্যমে প্রকাশ করে বলে রবার্ট ম্যুলার তার প্রতিবেদনে অভিযোগ করেন। যদিও রবার্ট ম্যুলার তার প্রতিবেদনে অ্যাসেঞ্জকে ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করেননি, তিনি শুধু অ্যাসেঞ্জের ওয়েবসাইট উইকিলিকসের নাম উল্লেখ করেছেন।

সামনে কি অপেক্ষা করছে? 

প্রথমে জামিন লঙ্ঘনের অভিযোগ দেখিয়ে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করেছিল লন্ডন পুলিশ, কিন্ত গ্রেপ্তারের পরপরই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার দেখায় তারা।

ব্রিটিশ সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাজ্যে অ্যাসাঞ্জের জামিন লঙ্ঘনের অপরাধ গৌণ হয়ে পড়েছে, মুখ্য হয়ে উঠেছে তার আমেরিকান কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর প্রশ্ন। তাই সবার মনে একটিই প্রশ্ন, ব্রিটিশ সরকার কি তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে? প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অ্যাসাঞ্জকে তুলে দেবার অংশ হিসেবে ইকুয়েডর ও ব্রিটিশ সরকার তৎপর হয়ে তাদের সর্বশেষ কার্যক্রম চালিয়েছে মনে হলেও, অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে মোটেই সহজ হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো তথ্য বা বক্তব্য প্রকাশ করা ফৌজদারি অপরাধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র অ্যাসাঞ্জের বিচার করবে গুপ্তচরবৃত্তি আইনে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, অ্যাসাঞ্জ সাবেক মার্কিন সেনা গোয়েন্দা বিশ্লেষক চেলসি  ম্যানিংয়ের সাহায্যে সরকারি কম্পিউটারে অবৈধভাবে প্রবেশ করেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই ম্যানিংয়ের হাত ধরেই ইরাক-আফগানিস্তান যুদ্ধের চাঞ্চল্যকর নথিগুলো পান জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, যেগুলো তিনি উইকিলিকসের মাধ্যমে সারা দুনিয়ার কাছে ফাঁস করে দেন। অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করার কিছুদিন আগেই উইকিলিকসের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করায় চেলসি ম্যানিংকে জেলে পাঠানো হয়।

কিন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তি সংক্রান্ত আইনে অ্যাসাঞ্জের বিচার করা হলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। মূল ফাঁকটা এখানেই।

২০১৭ সালে ইকুয়েডর সরকার অ্যাসাঞ্জকে সে দেশের নাগরিকত্ব দিয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে, এমন কোনো দেশে ইকুয়েডর কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণও করে না। অর্থাৎ এখন অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হলে ইকুয়েডর সরকারের নিজের বিধান নিজেরই ভঙ্গ করা হবে।

একই কারণে যুক্তরাজ্যও অ্যাসাঞ্জকে আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করতে পারে না। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে আপাতত যুক্তরাজ্যের কারাগারেই অ্যাসাঞ্জের বেশ কিছুদিন কাটবে। আগামী ২ মে অ্যাসাঞ্জের যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যর্পণ বিষয়ক ওয়ারেন্টের শুনানি হবে। অ্যাসাঞ্জকে কেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রকে তা ব্যাখ্যা করতে হবে ১২ জুনের মধ্যে।

এখন পর্যন্ত জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের পক্ষে কথা বলেছেন অনেকেই, এমনকি যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমসহ যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি ও নাগরিক সংগঠনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিরোধিতা করে নিন্দা জানাচ্ছে। তারপরও একটা কিন্ত থেকে যায়। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে নিশ্ছিদ্র নজরদারির আওতায় আনার প্রবল চেষ্টায় ব্যস্ত আমেরিকানরা তাদের পথের কাঁটাকে এত সহজে ছাড় দেবে ভাবার কোনো কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর মামলায় আটককৃত বন্দীদের সাথে নৃশংস আচরণের আরও অনেক নজির রয়েছে।

লেখক- হাসান উজ জামান 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট