ওটজিঃ হিমায়িত মমির রহস্য

হিম্মানবের দেহ; Image Source: Interesting Engineering

‘’ চল্লিশ হাজার বছর আগে আমাদের মতো হোমো স্যাপিয়েনসরা নিয়ানের মতো নিয়ানডারথালদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। এখন আমরা একটি নিয়ানডারথাল শিশু পেয়েছি, তার মাধ্যমে আমরা কি পৃথিবীতে এই হারিয়ে যাওয়া মানব প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনতে পারি?’’ 

মুহম্মদ জাফর ইকবালের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীনিয়ানেকিশোরী মনিকা বরফের মাঝে খুঁজে পেয়েছিল চল্লিশ হাজার বছর আগের নিষ্পাপ নিয়ানকে। বাস্তবে হামেশা এমনটা না ঘটলেও একেবারেই যে হয়নি তা না। বিজ্ঞানীরা কিন্তু শুধু ডায়নোসর বা দৈত্যাকার হাতির জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েই ক্ষান্ত হন নি, অতীতের মানুষ কেমন ছিল তারও সন্ধান করেছেন নিরন্তর।

নিয়ানডারথাল না হলেও বরফের মাঝে ঠিকই এক মানবদেহ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল তিন দশক আগে। চলুন সে সম্পর্কেই বিস্তারিত জেনে আসি।

কে এই ওটজি?

১৯৯১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। অনেকের মতো এরিকা এবং হেল্মুট সাইমনও ঘুরতে এসেছিলেন অস্ট্রিয়া ইতালির মধ্যবর্তী আল্পস পর্বতমালায়। হুট করেই তাদের চোখ পড়ে যায় এক মৃতদেহে। প্রথমে কোন ভ্রমণকারীর দেহ ভাবলেও পরীক্ষাগারের নানান পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে এর পরিচয়।

বলুন তো পাঠক, মৃতদেহটি কতদিন আগের ছিল? এক বছর? দশ বছর? নাকি আরও বেশি? পাক্কা ,৩০০ বছর আগের কোন মানুষের দেহ এটি! কিন্তু বরফের আস্তরণে পড়ে এত বছর পরেও অনেকখানি অক্ষত আছে এটি।  

কেমন ছিল হিমমানবের পৃথিবী?

পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে অদ্ভুতুড়ে সব তথ্য হাতে আসে গবেষকদের। যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও ৩০০০ বছর আগের এই দেহটি সরাসরিহটকেকেপরিণত হয় বিজ্ঞানীদের কাছে। এর নাম রাখা হয়ওটজিদ্য আইস ম্যান’!

ফুট ইঞ্চির এই পূর্বসূরির পোশাকও ছিল বেশ আধুনিক। ভেড়ার চামড়ায় তৈরি কোট, স্কিন লেগিংস, খড় বোঝাই জুতো, পশুর লোমে তৈরি টুপি এসব কিছুই বলে দেয় এতকাল আগেও লোকে বেশ ধোপদুরস্তই ছিল। গবেষণায় এও বেরিয়ে আসে, সেসময়কার লোকেরা মূলত পশুপালনকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করতো।

ফ্যাশনেও পিছিয়ে ছিল না তারা। খোদ এই ওটজির দেহেই আছে ৬১ টি ট্যাটু। অধিকাংশই লড়াইয়ের আঘাত ঢেকে রাখার উদ্দ্যেশে আঁকা। এগুলো আঁকার জন্য সেকালের মানুষ ছুরি জাতীয় বস্তু দিয়ে দেহে গর্ত করতো বা কাটতো, এরপর চারকোল বা কালি দিয়ে সেই ক্ষতে নকশা আঁকতো।  

কীভাবে মৃত্যু হয়েছিল ওটজির?

কী অদ্ভুত ব্যাপার! ওটজি লোকটা এত্ত এত্ত আগের যে তার মৃত্যুর সময় কী হয়েছিল তার  কোন সাক্ষ্যই এখন আর বেঁচে নেই। কথাটা কৌতুকসুলভ শোনালেও বিজ্ঞানীদের কাছে মোটেও হালকা ছিলনা এই প্রশ্ন।

২০১৭ সালে মুক্তি পায় ওটজিকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র  ‘Otzi:The Iceman’; Image Source: The Guardian

বিস্তর পরীক্ষার পরে অবশ্য বের হয়ে এসেছে মৃত্যুর আসল হেতু। কিন্তু ওটজি মশাই যোদ্ধা হলেও যে ধীরে ধীরে অসুখের তলে চাপা পড়ছিলেন তাও অস্বীকার করবার জো নেই। গলস্টোন, আর্সেনিক, হৃদরোগ, দাঁতের সমস্যা, খর্বকায় পা, যৌন ক্ষমতা হ্রাসসহ নানান সমস্যায় ভুগছিল তৎকালীন ৪৫ বছর বয়সী এই মমি।

মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, শত্রুপক্ষের আক্রমণ। তীক্ষ্ণ তীরের আঘাতেই মারা পড়ে হিমমানব। তবে সেই মরণ আঘাতের দুইদিন আগেও মরণপণ যুদ্ধ করেছিলেন ওটজি, তার প্রমাণও শরীরে স্পষ্ট। বিজ্ঞানীরা তার হাতে থাকা অস্ত্রে জনের রক্তের নমুনা পেয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, মৃত্যুর আগেও প্রতিরোধ গড়তে চাইছিল ওটজি। ঘাড়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলেই মারা যায় সে।

আবিষ্কার ও অভিশাপ

ওটজির দেহের পাশে চারটি অস্ত্র পাওয়া যায়তামার কুঠার, ছুরি, তীরধনুক এবং কাঠের দণ্ড। সম্ভবত এসব অস্ত্রই যুদ্ধ বা আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করতো প্রাচীন লোকেরা।

ফারাও মমি কিংবা কালোজাদুকরেরা যে রাশি রাশি অভিশাপ দিয়ে যেতেনসে আমরা সকলেই জানি। তাই বলে হিমমানবও দানব হয়ে যাবে? ওটজি সরাসরি কোন অভিশাপ না দিলেও, সংশ্লিষ্ট সাতজন ব্যক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বেশ চিন্তাতেই ফেলে অন্যদের।

প্রথম যেই ব্যক্তির মৃত্যু হয় তিনি ছিলেন ইনসব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট রেইনার হেন। ৬৪ বছর বয়সী রেইনার নিজ হাতে ওটজির দেহ বডি ব্যাগে ঢুকিয়েছিলেন। এই রহস্যের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকা রেইনারের মৃত্যু হয় এক সড়ক দুর্ঘটনায়। আর সেই দুর্ঘটনাও ঘটে এই মমি সংক্রান্ত এক লেকচার থেকে ফেরার সময়।

ওটজির পরনে ছিল এই পোশাক; Image Source: iceman.it

কুর্ট ফ্রিটজের মৃত্যুটাও আকস্মিক। এই গাইডই প্রথম রেইনারদের ওটজির কাছে নিয়ে যান। একদল পর্বতারোহীর সাথে যাওয়ার সময় পাহাড়ধসে মারা পড়েন ফ্রিটজ। অথচ সেই দলের আর কাউকেই তুষার ধস আঘাত করেনি!

এরপরের শিকার সেই তুলনায় বেশ দূরেরই বলা যায়। এক আমেরিকান পরিচালক আগ্রহের বশেই ওটজি কাহিনীকে রিলে তুলেছিলেন। এর কিছুদিন বাদেই মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ে তাঁর; অতঃপর মৃত্যু!

মৃত্যুর কালো থাবা

হেলমুট সাইমন যে কিনা প্রথম মমির সন্ধান পেয়েছিলেন, ২০০৪ সালে আচমকা গায়েব হয়ে যান অস্ট্রিয়ার গেইস্কারকোজেল চূড়া থেকে। খোঁজাখুঁজির পর তাঁর মোচড়ানো মৃতদেহ পাওয়া যায় স্রোতে ভাসমান অবস্থায়। শুধু তাই না, তাঁর মৃত্যুর কারণও বেশ সন্দেহজনক। দক্ষ এই পর্বতারোহী ৩০০ ফুট উঁচু থেকে পড়ে যাবেন, ব্যাপারটা অনেকেই মানতে পারেন না। হেলমুটের মৃতদেহের সন্ধানকারী ওয়ারনেকও মারা যান হেলমুটের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ঘণ্টা খানেক বাদেই।

বিজ্ঞানী লেখক কনরাড স্পিন্ডলার এই মমিকে নিয়ে লিখেছিলেন ‘The man in the ice’ নামক বইটি। এই গবেষণায় প্রত্যক্ষ যুক্তও ছিলেন তিনি। ২০০৫ সালের এপ্রিলে নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় মারা যান তিনিও।   

সব মিলিয়ে বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা হিমমানবের এমন ছবিকেই আদর্শ ভাবছেন; Image Source: Livescience.com

আমেরিকান পুরাতাত্ত্বিক টম লয়ও ছিলেন মমি গবেষক দলে। ৬৩ বছর বয়সী লয়কে তাঁর নিজ গৃহে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় ২০০৫ সালের অক্টোবরে। দীর্ঘ ১২ বছর যাবত রক্তের জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। তবে মৃত্যুর আগে ওটজি সংক্রান্ত কোন তাক লাগানো তথ্যের আভাসও দিয়েছিলেন তিনি। হয়তো সেই তথ্য ধামাচাপা দিতেই হিমমানব অভিশাপে মারা পড়েন তিনি!

১৯৯৮ সাল থেকে ইতালির বোলজানো শহরের South Tyrol Museum of Archeology তে সংরক্ষিত আছে এই মমিটি। প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক স্রেফ এই হিমমানবকেই দেখতে ছুটে আসেন এখানে। এর মাঝে কেউ কেউ বিশ্বাস করেন অভিশাপকে আবার কেউ বানোয়াট বলে উড়িয়েও দেন। বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী যে দলেই থাকুন না কেন, মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন গেঁথে নিনমৃত্যুর শেষ সময়ে কী ছিল ওটজির মনে? অভিশাপ বাণী না প্রিয়জনকে দেখবার আকুতি

লেখক- সারাহ তামান্না 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

সর্বাধিক পঠিত