ইনকা রাজার গুপ্তধন

বিপুল সম্পদের মালিক ছিল ইনকারা; Image Source: Treasure Net

‘হ্যালো, চৌধুরী সাহেব? আপনার ছেলে এখন আমাদের হাতে। ছেলেকে জীবিত পেতে হলে এই ঠিকানায় ১০ লাখ টাকা পাঠিয়ে দিন।‘

বাংলা সিনেমা বা ক্রাইম পেট্রোলের কোন দৃশ্যের কথা মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই। অপহরণের পর মুক্তিপণ চাওয়া জলভাত আজকাল। কিন্তু ইতিহাসেও যে এর ভূরি ভূরি নিদর্শন আছে তা কি জানেন?

ইনকা সভ্যতার হারানো গুপ্তধনের পেছনে কিন্তু এমনই এক গল্প আছে। মুক্তিপণের ইতিহাস? কি গোলমেলে ঠেকছে? তাহলে জেনে নিন ইনকা রাজার সেই হারানো গুপ্তধনের কথা।

ইনকাদের উত্থান

ইনকা সভ্যতার ইতিহাস খুবই সংক্ষিপ্ত। মাত্র ১০০ বছরেই তারা পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী সভ্যতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলো। ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা, পেরু,চিলি, দক্ষিণ পশ্চিম ইকুয়েডর, দক্ষিণ ও মধ্য পশ্চিম বলিভিয়া, দক্ষিণপূর্ব আর্জেন্টিনা ও দক্ষিণপশ্চিম কলম্বিয়া নিয়েই গড়ে উঠেছিল ইনকাদের আবাস।

ইনকাদের মাচুপিচু সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম; Image Source: Unsplash

মূলত সম্পদের আধিক্যের জন্যই খ্যাতি পায় ইনকারা। তবে এর বাইরেও মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে অসাধারণ কিছু অবদান রেখেছে তারা। সড়ক ও সেতু নির্মাণ, চিকিৎসা শাস্ত্রে গবেষণা, তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ, স্থাপত্য ও কৃষিকাজে উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে ইনকারা। তবে তাদের সভ্যতার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ নিদর্শন হলো পেরুর মাচুপিচু, যা কিনা ২০০৭ সালে তালিকাভুক্ত বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম।

স্প্যানিশ ষড়যন্ত্র

ইনকা সভ্যতা তথা রাজাদের কাহিনী বর্ণনা করতে গেলে রাত শেষ হবে নিশ্চয়ই। তবে স্বল্প সময়ে অপরিসীম উন্নতি ছাড়াও গুপ্তধনের রহস্যের জন্যও ইনকাদের প্রতি রয়েছে মানুষের অসীম আগ্রহ। তবে এই গুপ্তধনের রহস্য শুরু হয় যখন স্প্যানিশ ফ্রান্সিসকো পিজেরো পানামা থেকে ইনকাদের এই রাজ্যে প্রবেশ করে। সোনাদানা, মণি মাণিক্য লুটই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ক্রমে সমস্ত রাজ্য আক্রমণ ও ইনকাদের পরাস্ত করে এই স্প্যানিশ দল।

১৫২৬ সালে স্প্যানিশরা প্রবেশ করে ইনকা রাজ্যে। এরপরের বছরেই এক মহামারির আঘাতে মৃত্যু হয় ইনকা রাজা হুয়ায়না কাপাকের। ফলে তার দুই পুত্র ক্ষমতায় আসেন। এর মধ্যে হুয়াসকার নেন রাজ্য পরিচালনার ভার এবং আতাহুয়ালপা গ্রহণ করেন সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব। দায়িত্ব ভাগ করে নিলেও দুই ভাইয়ের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ ছিল তুঙ্গে।

গুপ্তধনের গুপ্তকথা

১৫২৯ সালে পিজেরো স্পেনে গেলে তৎকালীন ভাইসরয় তাকে ইনকা রাজ্য দখলের আদেশ দেন। সমগ্র প্রস্তুতি শেষে পিজেরোর দল যখন পেরুতে পৌঁছায় ততদিনে গৃহযুদ্ধে অনেকটাই অবসন্ন ইনকারা। ১৫৩২ সালে আরেক মহামারি স্মল পক্সের আঘাতেও ক্ষয়ক্ষতি হয় ইনকাদের। তবে অনেকে মনে করেন, এই রোগের জীবাণু নিয়ে এসেছিল স্প্যানিয়ার্ডরাই। গৃহযুদ্ধ আর রোগে পর্যুদস্ত দেশের ক্ষমতা সহজেই নিতে পারতো তখন পিজেরো। তবে ইনকাদের গুপ্ত সম্পদের হদিসটা তার তখনও জানা ছিল না। তাই আতাহুয়ালপাকে আটক করেন তিনি। মুক্তিপণ হিসেবে আতাহুয়ালপা তাকে এক ঘরভর্তি স্বর্ণ আর তার দ্বিগুণ রৌপ্যের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি । প্রতিশ্রুত সম্পদ পাওয়ার পর দেখা যায় যে এতে আছে ১৩,০০০ পাউন্ড ২২ ক্যারেটের সোনা এবং তার দ্বিগুণ পরিমাণ রূপা। আতাহুয়ালপা আটকের সাথে নিয়োজিত ১৬০ জনের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয় এই সম্পদ। পদানুসারে একেকজন একেক পরিমাণ সম্পদের ভাগ পেলেও সর্বনিম্ন ভাগটাও নেহায়েত কম নয়। ৪৫ পাউন্ড স্বর্ণ এবং এর দ্বিগুণ রৌপ্য পেয়েছিল একেবারে নিম্ন পদের লোকটি; যার মধ্যে শুধু সোনারই বর্তমান বাজারমূল্য আধা মিলিয়ন ডলার।

শিল্পীর চোখে আতাহুয়ালপার পরিণতি; Image Source: Ancient Origin

তবে এতে শেষ রক্ষা হয় নি ইনকা রাজার। লোভ বেড়ে যায় পিজেরোর। তাই হত্যা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে আতাহুয়ালপার কাছে আরও সম্পদের দাবি করে সে। ততদিনে হুয়াসকার আরেক ভাই মানকো দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে গেছেন। আতাহুয়ালপা তাই মানকোকে নির্দেশ দেন আরও সম্পত্তির বিনিময়ে যেন তাকে রক্ষা করে সে।

নির্দেশনা অনুসারে মানকো সম্পত্তি দেয়াও শুরু করেছিলেন। কিন্তু এর মাঝেই আতাহুয়ালপাকে খুন করে বসে পিজেরো। তখনই এক দল সৈন্য ইনকা সম্পদ নিয়ে রওনা হয়েছিল স্প্যানিশ দলের উদ্দেশ্যে। মাঝপথে এই খবরের ফলে উক্ত সম্পদের পাহাড় পাহাড়েই লুকিয়ে ফেলে তারা। অনেকে বলেন সৈন্যদলের নেতার  নির্দেশে নাকি সেই সম্পদ হ্রদে ফেলে দেয় বাকিরা। সত্য যাই হোক না কেন, সেই বিপুল সম্পদের খোঁজ এখনও কেউ পায় নি।

খোঁজ খবর 

পরবর্তীতে স্প্যানিশরা পেরুসহ ইনকাদের অন্যান্য শহরে লুটপাট চলালেও হারানো সম্পত্তি খুঁজে পায় নি। এরপর বহুজন নানা সময়ে উক্ত গুপ্তধনের খোঁজ পাওয়ার দাবি জানালেও সত্যতা নিশ্চিত হয়নি। আতাহুয়ালপার মৃত্যুর ৫০ বছর পর জুয়ান ভাল্ভার্দে’নামের এক স্প্যানিয়ার্ড গুপ্তধন লাভের দাবি জানান। এই ভাল্ভার্দে প্রায়ই নিখোঁজ হয়ে যেতেন, আর ফিরতেন অনেক সম্পদ নিয়ে। মৃত্যুর ঠিক আগে সে করে গেল এক অদ্ভুত উইল।  উইলে স্প্যানিশ সরকারের জন্য গুপ্তধনের মানচিত্র দিয়ে যান তিনি যা ‘ডেরোটেরো দে ভাল্ভার্দে’ নামে পরিচিত। তবে সেই মানচিত্র অনুসরণ করতে দুইজন এজেন্টকে পাঠায় সরকার। তারা অবশ্য কিছুই পায়নি সেসময়।

ইনকা সভ্যতায় ব্যবহৃত তৈজসপত্র, যার প্রায় সবই স্বর্ণের তৈরি; Image Source: Thoughtco

১৮৫০ সালে ইংরেজ উদ্ভিদবিজ্ঞানী রিচার্ড স্প্রুস ঘুরে আসেন ইকুয়েডর। ফেরত এসেই দাবি করেন ভাল্ভার্দের মানচিত্র বেশ কাজের আর তাতে নাকি সত্যিই গুপ্তধন মিলবে! ব্যস! গুপ্তধন খুঁজে বেড়ানো বার্থ ব্লেক তখনই আটঘাট বাঁধা শুরু করলেন। ১৮৮৬ সালে বিস্তর গবেষণার পর তিনি ভাল্ভার্দের মানচিত্র ঘেঁটে আবিষ্কার করেন সেই গুপ্তধনে মোড়া গুহা।

তাঁর বয়ানেই শুনুন বাকিটা।

‘সমস্ত গুহা জুড়ে হাজার হাজার স্বর্ণ আর রৌপ্য খণ্ড! সাথে আবার ইনকা এবং তাদের পূর্বসূরিদের নির্মিত হস্তশিল্প, গহনা, পাখি, নানান জীবজন্তু প্রভৃতির মূর্তিও আছে। এদের সবই আবার সোনার তৈরি। এগুলো এত নিখুঁতভাবে তৈরি যে আপনি কল্পনাও করতেও পারবেন না।‘

তবে তাঁর ভাগ্য খুব একটা ভালো ছিল না। সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু সম্পত্তি নিয়ে ফিরছিলেন তিনি। তবে ফেরত আসার পথে নিখোঁজ হয়ে যান। অনেকে বলেন, তিনি খুন হয়েছেন, আবার অনেকের মতে অভিশাপই গায়েব হওয়ার কারণ।

জাহাজ ডুবি

পিজেরোর লুট করা সব সম্পদই যে স্প্যানিশ সরকার পেয়েছিল তা নয়। অনেকখানি সম্পত্তি পানামা ফেরার আগেই জাহাজ ডুবির ফলে সমুদ্রের তলদেশে হারিয়ে যায়। সেই সম্পদ উদ্ধারের প্রচেষ্টা নিয়ে আছে আরও কাহিনী। পরবর্তী আয়োজনে আমরা সে ব্যাপারে বিস্তারিত জানাবো।

ব্লেকের পরিণতির পরে অনেক গুপ্তধন সন্ধানী পিছিয়ে গেলেও ইদানিং ফের আগ্রহ জেগে উঠছে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মধ্যে। বেশ গবেষণাও চলছে কিটো এবং এর আশপাশকে ঘিরে। কে জানে হয়তো একদিন মিলেও যেতে পারে ইনকা রাজার গুপ্তধন!

লেখক- সারাহ তামান্না 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

সর্বাধিক পঠিত