উৎসবের রায়হান

বাংলাদেশী কোন উদ্যোক্তা বিশ্বে রাজত্বকারী ৫০০ শীর্ষ প্রতিষ্টান বা ফরচুন ফাইভ হান্ড্রেড এর তালিকভুক্ত হতে স্বপ্ন দেখেন? রায়হান জামানকে না দেখলে সেটা বিশ্বাস করাই হতো না। তার সামগ্রিক কাজের পরিধি এবং পরিকল্পনা দেখে সেটা সম্ভব বলে মনে হয়েছে, যেটা তিনি অন্তরে বিশ্বাস বিশ্বাস করেন, যে আকাশ-ই তার শেষ সীমা। হ্যা বলছি, উৎসব ডট কম থেকে একাধিক ডাল পালা বিস্তার করা একটি গ্রুপ অফ কোম্পানীজ-উৎসব গ্রুপের উদ্যোক্তা রায়হান জামানের কথা।

‘উৎসব ডট কম যখন শুরু করেছিলাম তখন একটিই উদ্দেশ্য ছিল, একেবারেই ছোট একটি প্লাটফর্ম তৈরী করা যার মাধ্যমে দেশে প্রিয়জনের কাছে সহজেই, দেখে শুনে উপহার সামগ্রী পৌছে দেয়া।কারণ, ৯/১১ এর পর বাংলাদেশীরা দেশে যাননি অনেক দিন। কিন্তু নিয়মিত দেশে যেতে না পারলেও, প্রিয়জন বা স্বজনদের সাথে দুরত্ব যেন না তৈরী হয়, তার জন্য কিছু গিফট বা উপহার সামগ্রী পাঠানোর একটি মাধ্যম সৃষ্টি করা। এখন এই ১৭ বছরে সেটাতো একটা ছোটখাট বটগাছ-এ রুপ নিয়েছে।এখন বিশ্বের ১১ টি দেশে আমরা ডেলিভারী সার্ভিস দিচ্চি, আমাদের ভার্চুয়াল বসুন্ধরা টাইপের মার্কেটটিতে আছে ১৭ হাজারের বেশি আইটেম আর নিয়মিত গ্রাহক সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৫ হাজার।এটা থেকেই এখন আরো নতুন ১২/১৩ টি নতুন কোম্পানী হয়েছে। এগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই এখন স্বপ্ন’ – বলছিলেন উৎসব ডট কমের উদ্যোক্তা রায়হায় জামান।

ডিসেম্বরের ২৮ তারিখে যখন, জ্যামাইকা এভিনিউ এর হিলসাইড হোন্ডার ঝকঝকে অফিসে দেখা হলো রায়হান জামানের সাথে তখন তিনি একাধিক কাগজ পত্রে সাক্ষর দিতেই ব্যাস্ত। কোনটি নতুর গাড়ী বিক্রি’র কোনটি আগের কিস্তি সর্ম্পকিত অগ্রগতিপত্রের সাক্ষের আবার কোনটি একেবারেই দাপ্তরিক। এই সাক্ষার আর কাজের ফাকে ফাকে কথা বলছিলেন তিনি প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাথে। হ্যা, রায়হান জামানের কর্মক্ষেত্র হোন্ডা কোম্পানীর সাথে। হিলসাইড হোন্ডার তিনি ফাইনান্স ডিরেক্টর।কিন্তু স্বয়নে স্বপনে তার উৎসবের ছড়াছড়ি।

উৎসব এগ্রো, উৎসব কেয়ার, উৎসব ফার্মা, গ্লোবাল প্রসেস পয়েন্ট, উৎসববিডি ডট কম, উৎসব কুরিয়ার, উৎসব ফাউন্ডেশন, উৎসব ফ্যাসানস, উৎসব স্টাইলস, ইনফিনিটি মিডিয়া, উৎসব এনার্জি, চাদনী চক ডট কম প্রভৃতি নামে বিস্তৃত হয়েই যাচ্ছে তার উৎসব। শুধু মাত্র গিফট আইটেম নয় এখন, উৎসব ফার্মার মাধ্যমে রোগীদের বাসায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে সরাসরি ঔষধ পাটিয়ে দেয়ার জন্য এরি মধ্যে ঢাকায় ৪ টি উৎসব ফার্মার শোরুম কাজ শুরু করেছে। উৎসব কেয়ার’ এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অন্চলে রোগ চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা পৌছে যাচ্ছে। উৎসববিডি ডট কমের মাধ্যমে, কেউ যদি ফেনীতে বসে, ফকরুদ্দিন এর বিরানী খেতে চান, সেটাও পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর উৎসব এগ্রো’র মাধ্যমে ময়মনসিং নেত্রোকোনায় বিশাল ছাগল খামার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চাদনী চক ডটকমের মাধ্যমে ঘরে বসে যারা পোষাক তৈরী করেন ,তাদের বিকি কিনির ব্যবস্থা করার কাজ করছেন এখন।সব মিলিয়ে, সত্যিকারের একটি অনলাইন মার্কেটিং কোম্পানীর প্রতিষ্ঠা করেই ফেলেছেন, তিনি এখন সেটিকে এগিয়ে নেয়ার কাজের বেশি মনোযোগ।

‘দেশে অনেকেই চেষ্টা করেছে ডিজিটাল মার্কেটিং বা অনলাইন মার্কেটিং প্লাটফর্ম তৈরী করতে। চালডাল ডট কমের মত প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়। আজকের ডিল সহ যেগুলি আছে সেগুলি আগাতে পারছে না কারন, সেবায় সন্তুষ্টি নেই। একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠান দাড় করিয়েই তারা হয়তো পণ্য দিচ্ছে ভাল, কিন্তু নিজস্ব কুরিয়ার সেবা না থাকায় সেটি সময় মত গ্রাহকের কাছে পৌছাচ্ছে না। অথবা, পণ্যটি ভেঙে যাচ্ছে বা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা সে কারণে নিজস্ব কুরিয়ার সেবা দাড় করিয়েছি, উৎসব কুরিয়ার। আমাদের এমন কোন রেকর্ড নেই, যে গ্রাহক অসন্তুষ্টি তৈরী হয়েছে। সেকারনেই আমরা ছোট্ট একটি অনলাইন প্লাট ফর্ম থেকে এখন এত বড় প্রতিষ্ঠানে পরিনত হতে পেরেছি। আপনি নিজে পরখ করে দেখতে চান, ঢাকার কোন মিস্টির দোকান বা বিরিয়ানি খেতে চান, উৎসবে সার্ভিস নিয়ে নিজেই তা পরখ করতে পারেন। আর ঢাকায় বসে যদি আপনি সুনামগন্জের হাওরের কোন প্রেমিকাকে ফুল পাঠাতে চান, সেটাও পরখ করে দেখতে পারেন। কেননা, এই কাজ গত ১৭ বছর ধরে করেই টিকে আছে উৎসব ডট কম।’- এক নাগাড়ে কথাগুলি বলে যাচ্ছিলেন উৎসব এর প্রতিষ্ঠাতা রায়হান জামান।

এই কথা গুলির মধ্যদিয়ে একটি না বলা প্রশ্নের উত্তরও দিয়ে দিয়েছেন রায়হান জামান, সেটা হলো, আসলেই প্রতিষ্টানটি যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করতে পারছে কিনা বর্তমান বিশ্ব বাস্তবাতায়। কেননা, দেশের অনেকগুলি অনলাইন প্লাটফর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। দারাজ ডটকমের মত কেবল কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যাবসায় ভাল করছে। কারণ, সারা বিশ্বের অনলাইন কেনাবেচা প্রায় গিলে খেয়ে ফেলেছে এ্যামাজন ডট কম। তাবৎ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নির্ভরশীল এ্যামাজনের উপর।সেখানে, ছোট পুজি নিয়ে, কেবল মাত্র বাংলাভাষাভাষী মানুষ অথবা দক্ষিন এশিয়ার কিছু মানুষের জন্য আলাদা একটি অনলাইন মার্কেটিং এর উদ্যোগ তো ১৭ বছর ধরে চালিয়ে নেয়া সহজ কথা নয়। তাও আবার রাজকীয় কায়দায়। কেননা, প্রবাসে বাংলাদেশীদের যত বড় বড় অনুষ্ঠান, সম্মেলন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সব খানেই স্পন্সর বা সহযোগী হিসেবে উপস্থিত থাকেই উৎসব ডট কম। সেখানেও যথেষ্ট টাকা পয়সা খরচ করতে হয় প্রতিষ্টানটিকে। এসবের কথা উল্লেখ না করেও, কেমন করছে উৎসব’ এই প্রশ্নের উত্তরে হাসতে হাসতে রায়হায়নে উত্তর, ‘ অবস্যই আমরা গ্রিন লাইনে’। অর্থা৭, এটি লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠানে দাড়িয়ে গেছে। আর সেটাই উৎসবের পরিধি আরো বড় করার কারণ।

২০১৭ সালে প্রবাসীদের সবচে বড় আয়োজন, ফোবানা’র টাই্টেল স্পন্সর ছিল উৎসব ডট কম। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের ফোবানা সম্মেলনেরও শীর্ষ স্পন্সর উৎসব।এর বাইরে বছরে অন্তত শতাধিক ছোট খাট অনুষ্টানের পৃষ্টপোষকতা দিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকায় ফোক ফেস্টিভ্যাল এর আদলে, নিউইয়র্কের ম্যারিয়টে এই ফোক ফেস্ট এর আয়োজন নিয়ে কাজ করছে তার ইভেন্ট কোম্পানী ইনফিনিটি মিডিয়া। ২০১৮ তে জ্যামাইকার পরে, জ্যাকসান হাইটসে উৎসব এর আরো একটি শোরুম উদ্বোধন এর কাজ প্রায় গুটিয়ে নিয়ে এসেছেন। এসব কথাগুলি বলছিলেন, আর একের পর এক ফাইলে সাক্ষর করছিলেন রায়হান জামান। ‘ এই ব্যবস্থতার কারনেই, আমরা নতুন একজন সিইও বা প্রধান নির্বাহীকে নিয়োগ দিয়েছি। যেন, আমার ব্যবস্থায় উৎসবের গতি স্লথ না হয়ে যায়’

উৎসবের রঙ ভবিষ্যতে ভালোই ছড়াবে সেটা রায়হানের আত্ববিশ্বাস থেকেই প্রতীয়মান হয়।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট