‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের ডাক’

সাহেদ আলম,

আকায়েদ উল্লাহ কান্ড নিয়ে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে, এখন পরবর্তী করনীয় গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।মসজিদে নজরদারী বাড়বে কিনা, আরো হেইট ক্রাইম ঘটবে কিনা, এসব ভাবনার মধ্যে মুসুল্লিরা স্ব স্ব অবস্থান থেকেই ভাবছেন, আর কি ভাবে জাগিয়ে তোলা যায়, নিভৃতচারী সন্ত্রাসীদের বিবেক। সেই লক্ষ্যে, আপাতত প্রতিটি মসজিদে-ই গত শুক্রবারের জুম্মা এবং নামাজ শেষে আনুষ্ঠানিক ভাবে সন্ত্রাসবাদের বিপক্ষে পরিষ্কার অবস্থান ঘোষনা করে বক্তৃতা হয়েছে। সরকারী ভাবে কমিউনিটিগুলো সক্রিয় করে, মুসলিম সেন্টার এবং মসজিদগুলোর ব্যবস্থাপনা নীতি ঢেলে সাজানোর উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।

‘আমাদের কোন সরকারী নির্দেশনা নেই, যে কি করতে হবে। নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুরো পারিবারিক অভিবাসন বন্ধ করার কথা বলছেন, যেটা মূলত আকায়েদ কান্ডে’র প্রভাব। নিউইয়র্কের মেয়র, গভর্নর কেউ কিন্তু এ ক্ষেত্রে একজনের অপরাধের জন্য পুরো কমিউনিটিকে দোষারোপ করেনি। আমাদের ভাগ্য ভাল যে, নিউইয়র্কের পুরো সরকার ডেমোক্রেটিক এবং উদারপন্থী, সে কারনে আলাদা করে কোন নির্দেশনা নেই। তাতেই কি আমরা চুপ থাকবো? আমাদের নিজেদের করনীয় নেই? আমাদের পারিবারিক ভাবে সচেতন হওয়ার সাথে সাথে, সামাজিক ভাবে আমাদের যেসব ইউনিটি আছে, যার বেশির ভাগই মসজিদ কেন্দ্রিক, সেগুলিকে ঢেলে সাজানোর উপলব্দি দরকার’- প্রথম আলোর সাথে আলাপকালে এমন আক্ষেপ এর কথাই বলছিলেন, মেয়র অফিসে কমিউনিটির সর্ম্পর্ক স্থাপনের কর্মী শাহানা হানিফ, যিনি ব্রুকলিনের কাউন্সিলর ব্রাড লেন্ডারের অফিসে কাজ করেন।

২০০৬ সাল থেকেই নিউজার্সির মসজিদ আল ওমর এর উপর পুলিশের নাজরদারী ছিল। চলতি বছরে, কয়েক মাস আগে সাইফুল্লাহ সাইপভ নামের এক উজেবকিস্থানী নাগরিক ম্যানহাটানে মোটরবাইক চালকদের উপর ট্রাক তুলে দিয়ে ৮ জনকে হত্যা করার পর, জানা জায়, সাইফুল্লাই ঐ মসজিদ আল উমর-এর পেছনে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছিলেন ৩ মাস ধরে।সে ঐ মসজিদেও নিয়মিত নামাজ আদায় করতো সে। ফলে, হামলার পর সাইফুল্লাহকে হাতে নাতে ধরার পর, একে একে দুই, হয়ে যায় সমীকরণ,বেড়ে যায় ঐ মসজিদের উপর বাড়তি নজরদারী। নিউইয়র্কে বাংলাদেশী আকায়েদ কান্ড’র পর ব্রুকলিনের মসজিদ যেখানে আকায়েদ নামাজ পড়তো, সেখানে বাড়তি কিছু নিরাপত্তা এবং নজরদারী যোগ হয়েছে সঙ্গত কারনেই, তবে এই চিত্র সারা শহরের নয়। মসজিদগুলোতে নজরদারী বেড়েছে কিনা এমন জিঙ্গাসা আ্ছে অনেকের, তবে আশার কথা হলো, প্রথম আলোর তরফ থেকে অন্তত ১০ টি মসজিদের ঈমাম এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদের সাথে কথা বলে, এই ধরনের বাড়তি নজরদারীর কোন তথ্য বা আলামত পাওয়া যায়নি।

অবস্য মেয়র অফিস চাচ্ছে, সরকার নয়,  মুসুল্লিরা নিজেরাই নজরদারী বাড়াক। নিউইয়র্ক মেয়র বিল ডি ব্লাজিও’র কমিউনিটি এ্যাফায়ার্স ইউনিটের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা, যিনি ব্লাজিও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন, সারা সাঈদ, তিনি বলছেন, আপনাদের এই যে সন্ত্রাস প্রতিরোধে এগিয়ে আসাটাই সবচে বড় অগ্রগতি।এখন আপনারা নিজেদেরকে প্রশ্ন করুন, আপনাদের পরিচালিত মসজিদ গুলিকি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, সবার নিরাপত্তার জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন কিনা। একজন খ্রিস্টিয়ান বা অন্য ধর্মের প্রার্থনালয়ে যেভাবে কেউ প্রবেশ করতে পারে, দেখতে পারে ,জানতে পারে তেমন করে, আপনাদের মসজিদ গুলিতে ভিন্ন ধর্মী কেউ যেতে পারে কিনা।

সারা সাঈদকে নিউইয়র্কের বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত আলেমা ওলামারা ডেকেছিলেন, সন্ত্রাস প্রতিরোধে আলেম ওলামাদের করনীয় শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করে। জ্যাকসান হাইটস এ সারা সাঈদ যেখানে, প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সেখানে প্রায় অর্ধ শত মসজিদের ইমাম এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

‘  আকায়েদ এর ঘটনা আপনাদের, আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আসলেই আমাদের কিছু একটা করা দরকার, সুতরাং আমরা কি করতে পারি? ….যেহেতু সহিংসতাগুলো ইসলামের নামেই হচ্ছে। দেখুন মেয়র ব্লাজিও এবং সরকার কিন্তু এর জন্য বাংলাদেশী কমিউনিটি বা মুসলিম কমিউনিটিকে দোষী হিসেবে বর্ণনা করেননি। কারণ, আমরা সন্ত্রাসের জন্য ইসলাম বা বা কমিউনিটিকে দোষারোপ করিনা, কিন্তু অন্য ভাবে আপনাদেরও দেখতে হবে, কেন কিছু মানুষ ধর্মকে সন্ত্রাসের পন্থা হিসেবে ব্যবহার করছে, তাদের নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য’ -ইমাম এবং আলেমদের সামনে দেয়া বক্তৃতায় বলছিলেন সারা সাঈদ।

নিজে একজন মুসলিম এবং নারী হওয়ার পরও, এক এগারতে টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর নিজের নিরাপত্তাহীনতা আর হীনমন্যতার উদাহারণ টেনে তিনি একটি ছক একে, এ থেকে কমিউনিটিকে উত্তরণের পথ বলে দিচ্ছিলেন। ‘

আমাদের চিন্তা করতে হবে, আমরা এখান থেকে কি ভাবে উত্তরণ ঘটাতে পারি, আমাদের মসজিদ গুলোকি শুধুই প্রার্থনার জায়গা? অতীতে এগুলি ছিল আমাদের নিজেদের আন্তরিকতা, এবং সামাজিক মেল বন্ধনের জায়গা? একজন বিধর্মী নারী যদি রাস্তায় বৈষম্যের স্বীকার হয়, সে কি দৌড়ে মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিতে পারে? মসজিদ গুলোকে কি আমরা সবার জন্য আস্থার জায়গা করতে পেরেছি? আপনাদেরকে এইটা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। নারীরা হলো, একটি পরিবারের বাচ্চাদের পথ নির্দেশক। মহিলারা যদি মসজিদে আসতে না পারে, তাহলে আপনার সন্তানেরাও মসজিদ মুখি হবে না। …আপনারা কেন শুধুই অর্ন্তমুখি? এই শহরের মেয়র কি করছে, কাউন্সিলররা কি করছে সে বিষয়ে আপনারা জানতে চান না কেন? কেন, ভিন্ন ধর্মীয় গোষ্টীর সাথে আপনাদের দুরত্ব? এই দুরত্ব কমাতে হবে, মানুষে মানুষে উন্মুক্ত সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।এটা একটা গুরুত্বপূর্ন সময় আমাদের কমিউনটির জন্য, এখনই যদি সচেতন না হন, তাহলে পিছিয়ে যাবেন।আমি আপনাদের সাথে কাজ করতে চাই, এখন আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে’ – মেয়র অফিসের সিনিয়র উপদেষ্টা সারা সাঈদের বক্তব্যে উঠে আসে এসব দিকও।

উলামরা একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছেন ঐ অনুষ্ঠানে, সেখানে নিজ বাচ্চাদের উপর ভালবাসা নিয়ে নজরদারী বাড়াতে বলেছেন অভিভাবকদের।এখানে ইমামদেরকে, ইন্টারনেট ভিত্তিক যেসব ঘৃনা উদ্রেককারী ওয়েব সাইট এবং ভিডিও প্রচারনা আ্ছে, সেসব বিষয়ে খুতবায় সতর্কতা মুলক বক্তব্য দেয়ার আহবান জানানো হয়। বিপরিতে কোন কোন ডিজিটাল মাধ্যমে নিরাপদ তথ্যের প্রবাহ আছে সে সম্পর্কে বেশি বেশি প্রচারণার আহবান জানান আলেমবৃন্দ।

আর মেয়র অফিসে কাজ করা চার্চ ম্যাকডোনাল্ডের শাহানা হানিফের মত তরুনকর্মীরা এখন একটু সংঙ্গবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছেন। ভাবছেন, কিভাবে আকায়েদ এর বয়সী তরুনদেরকে কমিউনিটি ক্লাব বা পাঠাগার বা অন্য কোন ভাবে একটি  মেলবন্ধনের জায়গা তৈরী করা যায়। সেই সাথে , বাবা-মা’দের একটু বেশি সক্রিয় ভুমিকাও আশা করেন তারা। এখনও স্থানীয় আর অন্চল ভিত্তিক রাজনীতি, আওয়ামী লীগ বিএনপির দলাদলির বাইরে, এই দেশে বসবাস করা সন্তান এবং তাদের মানষিক বিকাশের জন্য বাবা মায়েরা একটু বেশি সয়ম ব্যয় করবেন, সেটাই বেশি দরকার বলে মানছেন শাহানা।সেই লক্ষে, কমিউনিটি কেন্দ্র তৈরী করা, আর সমিতির বাইরে, তরুনদের মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরীতে পয়সাওয়ালা প্রবাসীদের এগিয়ে আসতে বলছেন তিনি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট