ইব্রাহিম চৌধুরী।

কানসাস এর লরেন্স থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক রশায়নের শিক্ষক বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত সৈয়দ জামালের দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে বিশাল গনঐক্যমত্য সৃষ্টি হয়েছে গোটা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে কোন নিদৃষ্ট একজনের ডিপোর্টেশন ঠেকাতে এত বড় আলোচনা খুবই কময় হয়েছে আমেরিকার গণমাধ্যমে।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, একজন রশায়নের শিক্ষক তার বাচ্চাদের স্কুলে নিতে ঘর থেকে বেরিয়েছেন, আর ইমিগ্রেশন পুলিশ তখন-ই তাকে গ্রেফতার করেছে।

সিবিএস নিউজের শিরোনাম, ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা একজন রশায়নের শিক্ষককে আটক করেছে আইস পুলিশ’। আর এনবিসি লিখেছে, কানসাসের একজন রশায়নবিদ যিনি ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে তাকেও দেশে ফেরত পাঠাতে চায় ইমিগ্রেশন পুলিশ। অন্যদিকে, সিএনএন শিরোনাম করেছে, ‘একজন শিক্ষককে দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে কানসাসের লরেন্স কমিউনিটির অভুতপূর্ব ঐক্য’। এসব ছাপা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার সব গনমাধ্যমে।টেলিভিশনে চলছে টক শো আর অভিবাসন আইন নিয়ে আলোচনা সমালোচনা।

কানসাসের লরেন্স থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক সৈয়দ জামালের পক্ষের এসব সংবাদ এত বেশি মানুষ পড়েছেন যে, ৬ ফেব্রুয়ারীতে ফেসবুকের ট্রেন্ডিং বা সর্বর্চ্চ আলোচিত বিষয়ে উঠে আসে। এসব সংবাদ নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার পাশাপাশি মানুষ নানা রকম মন্তব্যও করছেন।

‘সময় এসেছে সৈয়দ জামালের মত মেধাবি এবং প্রজ্ঞা সম্পন্ন মানুষদের পক্ষে কথা বলার। সবাই জেগে উঠুন, আর সৈয়দ জামালের দেশে ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান। একই সাথে রুখে দাড়ান, আমাদের পাগলপ্রায় অভিবাসন রীতির প্রতিও’ – ডেক্সাই জুন নামের এক ব্যাক্তি একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছেন তার ফেসবুক ওয়ালে, যেখানে শিরোনাম, জামালের দেশে ফেরা ঠেকাতে হাজারো মানুষের চিঠি’ শিরোনামের রিপোর্টে। নাদিয়া হুসেইন নামক একজন মানবাধিকার কর্মী তার ফেসবুক ওয়ালেলিখেছেন,
‘আমাদের সরকার আমাদের ট্যাক্সের টাকায় চলা অভিবাসন দপ্তর আর ইমিগ্রেশন পুলিশকে ঐসব মানুষের দেশে ফেরত পাঠানোর মিশনে নেমেছে, যাদের দরকার ছিল এই দেশে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে ৩০ বছর ধরে আছেন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রসায়নবিদ সৈয়দ জামাল। এই শিক্ষাবিদ তিন সন্তানের জনক। এসব সন্তান এবং তাঁর স্ত্রীও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
কানসাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী সৈয়দ জামাল গত ২৪ জানুয়ারি সন্তানদের স্কুলে দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় তাকে আটক করে আইস-পুলিশ। সৈয়দ জামালকে যখন আটক করা হয়, তখন তাঁর স্ত্রী তাঁকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজে বাধা দেওয়ার দায়ে তাঁরও সাজা হতে পারে বলে সতর্ক করেন আইস-পুলিশ সদস্যরা। সৈয়দ জামালের বড় ছেলে ১৪ বছর বয়সের তাসিন জামাল একটি ভিডিও বার্তায় বাবার দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে সবার কাছে আবেগঘন অনুরোধ জানিয়েছে। ভিডিও বার্তায় তাসিন বলে, ‘বাবাকে ছাড়া এই বাসায় আমরা নিঃস্ব। যুক্তরাষ্ট্রের আইন তাঁকে নাগরিকত্ব গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রেখেছিল। আমার ছোট ভাইটি সারাক্ষণ কাঁদে। আমার মা একটি কিডনি নিয়ে বেঁচে আছেন। তিনিও মারা যেতে পারেন তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হলে। ভাইবোন আমরা এখনো অসহায় বাবাকে ছাড়া। এ অবস্থায় আমি সকলের কাছে অনুরোধ করছি, আমার বাবাকে আমাদের পরিবারে ফিরিয়ে আনার জন্য।’

এই অনুরোধে মাঠে নেমেছে কানসাসের লরেন্সের মানুষ। তারা সভা করে, প্লাকার্ড নিয়ে সৈয়দ জামালের মতো বাবা, শিক্ষাবিদ এবং বিজ্ঞানীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করেছে। চেনজ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ১৫ হাজার মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহের অভিযানে নেমেছে তারা।তবে সর্বশেষ খবরে সৈয়দ জামালের পক্ষে শুধু ১৫ হাজার মানুষ সাক্ষর-ই করেনি, বরং তার সংবাদটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত ডিপোর্টেশন সংবাদে পরিনত হয়েছে।

৫৫ বছর বয়সী সৈয়দ জামাল ১৯৮৭ সালে কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য আসেন। পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরত যাওয়ার পর আবার এইচ ওয়ান-বি ভিসায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তবে তার গ্রিন কার্ড বা নাগরিকত্ব ছিল না। ২ ফেব্রুয়ারি আইস দপ্তরের কাছে চিঠি লিখে জামালের আইনজীবী বারনেট অন্তত তিন সপ্তাহের সময় চেয়েছেন। এর মধ্যে তাঁর দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে নতুন করে কাগজপত্র জমা দেবেন বলে জানিয়েছেন। ইমিগ্রেশন পুলিশ অবশ্য দাবি করছে, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার ডিপোর্টেশন আদেশ ছিল এবং তিনি সেই আদেশ মান্য করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এবিসি টেলিভিশনের কাছে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়া আইস দপ্তর অবস্য, জানিয়েছেন, সৈয়দ জামাল ১৯৯৮ সালে একবার বৈধভাবে অস্থায়ী নন-ইমিগ্রান্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। দুই দফায় তাঁর বিরুদ্ধে ডিপোর্টেশন আদেশ (ফেরত পাঠানোর আদেশ) ছিল আদালতের। সর্বশেষ ২০১২ সালে তাঁকে একবার পুলিশ গ্রেপ্তার করে তাঁর স্থায়ী বসবাসের অনুমতিসংক্রান্ত জটিলতা খুঁজে পেলেও তাঁকে সে সময় ফেরত পাঠানো হয়নি। ২০১৩ সালে আমেরিকার ইমিগ্রেশন আপিল বোর্ড তাঁর আবেদন নাকচ করে দেয়। আদালতের সেই আদেশ কেবল পালন করছে তারা।
সৈয়দ জামালের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাঁকে দেশে ফেরত পাঠালে তাঁর প্রাণহানি হতে পারে। চিন্তা আর মননে অসাম্প্রদায়িক বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিদের হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। সে কারণে সৈয়দ জামালের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তাঁর পরিবার।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *