সাহেদ আলম

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত পা্রয় ১১ মিলিয়ন কাগজপত্রহীন অভিবাসীকে বৈধতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।নিউইয়র্ক টাইমস এই সম্ভাবনার কথা লিখেছে, কেননা, ৯ জানুয়ারী অভিবাসন সংস্কার ইস্যুতে যে হাইলেভেল মিটিং হয়েছে, সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন উক্তি করেছেন বলেই মনে করছেন বেশ কিছু আইনপ্রনেতা।ডেমোক্রাট এবং কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত ২৬ জন সিনেটর মিলে, ট্রাম্প প্রসাশনের সাথে ঐ দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্টিত হয়, যার একটা বড় অংশ গনমাধ্যমের সামনেই আলোচনা হয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার অভিবাসন এবং নাগরিকত্ব প্রশ্নে আগের প্রায় সব কট্টর অবস্থান একেবারে উল্টে দেবার কথা জানান একে একে।বলেন, ‘ঠিক আছে, আপনারা যদি আমার দিকে সব আগুনের দোলা ঠেলে দিতে চান, আমিও সেই আগুন নিয়ে খেলতে প্রস্তুত, আমি পরোয়া করিনা’। তবে সীমান্তে নিরাপত্তা এবং দেয়াল নির্মানে অর্থছাড়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে দুই দলতেই, সে ব্যাপারে বার বার নিজের অবস্থান জানান তিনি।

অবৈধদের নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষন করেন একজন রিপাবিলকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। তিনি বলেন, ১১ মিলিয়ন মানুষকে নাগরিকত্ব দেয়ার বিধান প্রণয়ন করে এর একটা বিহিত টানলে সেটা মানবিক হতে পারে। সেটা প্রথমবার আমলে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, বলেছেন, দেখা যাক, ডাকা প্রকল্পের একটা সুষ্ঠ সমাধানের পর আপনারা সবাই মিলে যদি আমার দিকে ‘হিট’ ঠেলে দেন, আমিও সেটা নিতে জানি!।

অবস্য, ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের প্রতিবেদনে বলছে, এমন অনেক কথাই বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু পরক্ষনে আবার নিজেই সেটা পাল্টিয়ে তার আগের অবস্থানে কথাও বলতে শোনা গেছে ট্রাম্পকে। গনমাধ্যমের সামনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পরে, আলাদা যে রুদ্ধদার বৈঠক হয়েছে, সেই মিটিং এ খোলাসা করে তিনি কিছু বলেছেন কিনা সেটা জানতে চাইলে, একজন ডেমোক্রাট দলীয় সিনেটর বলছেন, অভিবাসন প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন অনেক প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে আমার মাথা এখনও ঘুরছে, যে একজন মানুষ এমন ৩৬০ ডিগ্রি নিজেকে পরিবর্তন করার কথা বলতে পারেন কিভাবে। সে কারনেই সংবাদ মাধ্যমে এখন জোর আলোচনা, ডোনাল্ড ট্রাম্প কি আসলেই ঝুলে থাকা ১১ মিলিয়ন বা এক কোটি দশ লাখের বেশি মানুষের জন্য নাগরিকত্বের পথ উন্মক্ত করতে পারেন?

এই সম্ভাবনার কথাটি আসছে কেননা, এর আগে ৭০ আর ৯০ এর দশকে এমন অভিবাসীবান্ধব নাগরিকত্ব আইন হয়েছিল দুটোই রিপাবিলকান শাসন আমলে। ১৭৮৭ সালে প্রনীত প্রথম উদার নাগরিকত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা হয় সংবিধান সংশোধন এর মাধ্যমে।সেটার প্রেক্ষিতে ১৭৯০ সালে নাগরিকত্বের নতুন বিধান করা হয়। যেখানে নিয়ম করা হয়, আইন মানা এবং সচ্চরিত্রের সাদা মানুষরা , যারা দুই বছরের অধিক সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে, এবং ১ বছরের বেশি সময় ধরে একটি নিবাসে বসবাস করার রেকর্ড দেখাতে পারবেন, তাদেরকে নাগরিকত্ব দিয়ে দেয়ার বিধান করা হয়। এর পরেও যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের স্রোত কখনই বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েছে দিনে দিনে।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের বিধানসুমহ:

এর পর ১০৯৫ সালে ঐ আইনকে সংষ্কার করা হয়, এবং বিধান করা হয়, যে নাগরিকত্ব পেতে হলে, নূনতম ৫ বছরের বসবাসের রেকর্ড থাকতে হবে এবং তিন বছর আগেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নাগরিকত্ব পাওয়ার ব্যাপারে ইচ্ছা পোষন করে আবেদন জমা দিতে হতো। ঐ একই আইনের সংষ্কার হয় আবার ১৯৯৮ তে, যেখানে নাগরিকত্বের জন্য ১৪ বছরের বসবাস রেকর্ড দেখা হতো, আর আবেদন করতে হতো ৫ বছর আগে। এই নিয়ম গুলোই পরবর্তীতে আধুনিকায়ন করা হয়, আঠার’শ শতাব্দীতে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন এ্যাক্ট যেটি এখনও বহাল আছে সেটি মূলত ১৯৯০ সালের অধ্যদেশটি যার মাধ্যমে একই সময়ে লক্ষ লক্ষ নাগরিকের বৈধ হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। সিনেটর টেড কেনেডি ১৯৮৯ সালে এই বিল প্রস্তাব করেন যা পাশ হয় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে। এটির অধীনে বছরে ৭ লক্ষ মানুষকে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এই সময়েই, এইচ ওয়ান ভিসা, কর্মক্ষেত্রের অনন্য ভিসা আর যারা আছেন এই দেশে তাদের পরিবারকে গ্রিনকার্ড দিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর রাজনৈতিক আশ্রয় বা কাগজপত্রহীন যেসব লক্ষ লক্ষ মানুষ এই দেশে এসে আর ফিরে যাননি, তাদের জন্য রিফিউজি ভিসা বা গ্রিনকার্ডের জন্য কিছু শিথীল নিয়ম কানুন জারি করে বৈধ হওয়ার পথ উন্মুক্ত করা হয় প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে। সেসময়, কেউ অন্য নাগরিকদের বিয়ে করার কাগজ দেখিয়ে, অথবা অন্য প্রক্রিয়ায় গ্রিনকার্ড পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। যারা এর আগে দীর্ঘ দশক ধরে কাগজপত্রহীন ছিলেন, অথবা অবৈধভাবে বসবাস করছিলেন, তাদের নাগরিকত্বের পথ উন্মুক্ত হয়। সেই প্রলভোনেই, যুক্তরাষ্ট্রের নানা সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ঢুকে পড়েছিল পরবর্তী বছর গুলিতে। এমনকি প্রতিবছর শুধু মেক্সিকো সীমান্তে প্রায় আড়াই থেকে তিন লক্ষ মানুষ প্রবেশ করেন এখনও শরনার্থী হয়ে, অথবা নিরাপত্তা প্রহরীদের চোখে ফাকি দিয়ে। এই অবৈধ অনুপ্রবেশ অনেক খানি-ই বন্ধ হয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কড়াকড়িতে, তবে আগে যারা এসেছেন এবং বহু বছর ধরে এই দেশে বসবাস করছেন, এমন এক কোটি ১০ লক্ষ মানুষের ভাগ্য কি হবে সেটাই ছিল ২০১৬ সালে নির্বাচনী এজেন্ডা।

সেই নির্বাচনী প্রচারণায় অভিবাসন আইন সংস্কার আর সব অবৈধকে পর্যায়ক্রমে দেশে ফেরত পাঠানোর কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দী হিলারী ক্লিনটন, অবৈধদের উন্মুক্ত নাগরিকত্ব দেয়ার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। নির্বাচনে জয়ী হন ডোনাল্ড ট্রাম্প, কিন্তু এখন তার মুখে কিছুটা ভিন্ন সুরে, আবার আলোচনা জোরদার হয়েছে যে, কি করতে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে অবৈধদের নাগরিকত্ব দেবার বিষয়ে এখনই পরিষ্কার করে কিছু বলছেন ট্রাম্প ডোনাল্ড ট্রাম্প।এখন তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে গৃহীত ডেফারর্ড এ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড এ্যরাইভাল-ডাকা প্রকল্পের ৬ লক্ষ ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে বৈধতা দেয়ার আগে, কিভাবে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মানের টাকা পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে তিনি বলছেন, ডেমোক্রাটরা যদি চায় এসব শিক্ষার্থী যারা শিশুকালে তাদের বাবা মায়ের হাত ধরে এই দেশে এসেছিলেন কাগজপত্রহীন হয়ে, তাদেরকে নাগরিকত্ব দিতে হবে, তাহলে তারা যেন, সীমান্তে দেয়াল নির্মানের বিষয়টি আলোচনায় অর্ন্তভুক্ত করে। এর সাথে তিনি বলছেন, চেইন ইমিগ্রেশন বা পারিবারিক অভিবাসন আর ডিভি লটারী বন্ধের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদের-কে, তাহলেই ডাকা প্রকল্পে একটি সিদ্ধান্তে আসবে তার সরকার।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *