সাহেদ আলম
দেশে ফিরে যাওয়াটা এখন আর কোন ভবিষ্যত বিবেচনার মধ্যেই নেই বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত নাইম , অজেয় অথবা মনোলোভা’র।তারা তিনজনই এমন একটা সময়ে এই দেশে বাবা মায়ের সাথে পাড়ি জমিয়েছিলেন যখন তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেয়ার বয়স ছিল না। কাগজপত্রহীন বাবা মায়ের সন্তান হিসেবে তারা লজ্জিত নয়, বরং নিজেরা দাপটের সাথে কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্র গঠনে, নিজেদের স্বপ্ন পূরনে। এতদিন জেনেছিলেন, একটি নির্দিষ্ট সময় পার হলেই তারা নাগরিকত্ব পাবেন। তার পর বাবা মাকে বৈধ করে নিতে পারবেন। হ্যা, তাদের সেই স্বপ্নের ‘ডেফার্ড এ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড এ্যারাইভাল’-ডাকা প্রকল্প, সংক্ষেপে ‘ড্রিমার’ এ্যাক্ট। সেই ড্রিমার এ্যাক্ট বহাল রাখা না রাখার যাতাকলেই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার বন্ধের কার্যক্রম। কেননা, প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলের এই বিধানকে তুড়ি মেরে এক নির্বাহী আদেশে বাতিল করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এখন, সেটা আবার ‘নিষ্কলুষ’ ভাবে বহাল রাখার জন্য যুদ্ধ চলছে ডেমোক্রাট দের তরফে।অন্যদিকে, ড্রিমারদের দাবীদাওয়া কিছুটা পূরন, করে, তবে তাদের বাবা মাকে বন্চিত করে একটি ‘দ্বিত্বীয় শ্রেনীর নাগরিকত্বে’র বিধানে কিছুটা সম্মত ট্রাম্প প্রসাশন। সেটা নিয়ে সুরাহা না হওয়ায় সরকার চালাতে প্রয়োজনীয় অর্থবরাদ্দের সম্মতি দিচ্ছে না ডেমোক্রাট দল। এ নিয়ে যুদ্ধ চলছে, ওয়াশিংটনের ক্যাপিটাল হিলে, যুদ্ধ চলছে ড্রিমারদেরও।
নাইম ইসলামের বয়স এখন ২৫ বছর। তার বয়স যখন ৯ বছর তখন বাবা-মায়ের হাত ধরে পাড়ি দেয় যুক্তরাষ্ট্রে। এই ১৪ বছরে তার জীবন যাপন, চলা ফেরা বন্ধুত্ব, স্বপ্ন সবই আমেরিকা কেন্দ্রিক। কুইন্স কলেজ থেকে পড়া শোনা করার পর নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতেই সে নিজেকে আলাদা করেছে, একজন অভিবাসন অধিকার কর্মী হিসেবে নাম লিখিয়ে। হ্যা বলছি বাংলাদেশী দেশী বংশোদ্ভুত নাইম ইসলামের কথা।
শরীয়তপুরে জন্ম নেয়া নাইম, যুক্তরাষ্ট্রের আরো ৭ লাখ ৯০ হাজারের মত যেসব স্বপ্ন তারুন্য আছে, সেই ড্রিমারদের একজন। বাবা মায়ের এখনও কাগজপত্র নেই। প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে, এমন কাগজপত্রহীন বাবা মায়েদের সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য গড়া ডেফার্ড এ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড এ্যরাইভাল নামক বিধান, যেটিকে ড্রিম এ্যাক্ট বলা হয় সেই এ্যাক্টের একজন সুবিধা ভােগী। তার সেই সুবিধা কিছুদিন আগে পূর্ননবায়ন করা হয়েছে, সেকারণে আরো বছর খানেক এই দেশে কাজের অনুমতি আছে তার।এর পরের ভবিষ্যত কি জানা নেই। অথচ, তারা ঘোষনা দিয়ে সামনে এসেছিল কারণ, রাষ্ট্র তাদেরকে সুরক্ষা দেয়ার অঙ্গীকর করেছিল। অথচ, এখন স্বঘোষিত কাগজপত্রহীন হিসেবে দেশে ফেরত পাঠানোর খড়গের মধ্যে আছে নাইমের পুরো পরিবার।
‘দেখুন, এটা তো মেনে নেয়া যায় না। আমি এখন বাংলাদেশে ফিরে কি করবো।আমি তো বাংলা ভাষাটাও ঠিক মত শিখত পারিনি। আমার স্বপ্ন,আমার বেড়ে উঠা আমার সামনের সব স্পন আমেরিকাকে নিয়ে।আমার জন্য দ্বিত্বীয় কোন টিক চিন্হ নেই যে, যেটাকে আমি অপশন হিসেবে টিক দেব’ – বলছিলেন নাইম।
‘কিন্তু আমি চাই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান চাই। ডেমোক্রটা লিডাররা কথা দিয়েছে যে ড্রিম এ্যক্ট কার্যকর করবে।ডেমোক্রাট রাজনীতিবিদ যারা অভিবাসীদের জন্য লড়াই করছে বলে, কিন্তু তারা সহজেই ছাড় দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আমাকে যদি একটি পথ নির্দেশনা দেয়া হয় যে আমি ১০ বছর পরে নাগরিক হতে পারবে। আমি ধরুন সেটা মেনে নিলাম। কিন্তু শুধু আমার নিজের জন্যে তো আমি চাই না। আমি কিভাবে মেনে নেব, যে আমার বাবা মাকে ডিপোর্ট করবে, সেটা আমি কিভাবে মেনে নেব। আমি চাই ডেমোক্রাটরা তাদের চাপ অব্যহত রাখুক। যদি ড্রিম এ্যাক্ট না পাস হয় তাহলে তার পুরো দায় ভার সিনেট বিরোধী দলের প্রধান চাক শুমার এর উপরে পড়বে।কেননা, একটা সমাধান হয়ে যাওয়া বিষয়, ড্রিম এ্যাক্টকে বাতিল করতে চেয়েছেণ ট্রাম্প, শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক ফায়দা লাভের জন্য’
নাইমের মত আরেকজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ড্রিমার অজেয় ইউসুফ। ঢাকার ধানমন্ডিতে কৈশোর ফেলে আসা অজেয়, তার ১৪ বছর বয়সে, দু বছরের ছোট বোন মনোলোভা সহকারে পাড়ি জমান আমেরিকায়। বাবা মায়ের বৈধ কাগজপত্র নেই এই দেশে থাকার। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় পরে তারা নাগরিকত্ব পাবে যদি নিজেদেরকে আনডকুমেন্টেড বা কাগজপত্রহীন ঘোষনা দেয়-এমন রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতিতে তারা নিজেদেরকে ডাকা প্রকল্পের জন্য আবেদন করে। এখন, সেই কাগজপত্রহীনদের যখন দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রসাশন, সেটাকে তাদের সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতারণা হিসেবেই দেখছেন অজেয় ইউসুফ।
‘দেখুন, এখন যেটা হচ্ছে সেটা অনেক খারার একটি ভবিষ্যত। আমার বয়স এখন ২৬। বলা হচ্ছে, আমাকে নাকি আরো ১৩ বছর পরে নাগরিক হতে হবে। তাহলে এতদিন আমি কেন ট্যাক্স দিচ্ছি? আবার বলা হচ্ছে আমাকে নাগরিকত্ব দেয়া হলেও, আমি আমার বাবা-মাকে বৈধ করতে আবেদন করতে পারবো না। এটা কিভাবে সম্ভব? আমি আমার বাবা মাকে ছেড়ে থাকবো কিভাবে।, সুতরাং ট্রাম্প প্রসাশন যেসব বিষয় নিয়ে দর কষাকষি করছে সেটাতে একটি বিষয় পরিষ্কার , আমাদেরকে দ্বিত্বীয় শ্রেনীর কোনমতে নাগরিকত্ব দেয়ার চেষ্টা করছে। যেটা পুরোপুরি অবিচার। আমরা এই অবিচার সইবো না। আইন যত শক্ত হবে, ত্রুটিপূর্ন হবে, আমরা ততটাই সংগঠিত হব।আমাদের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলুক, সেটা আমরা হতে দেব না। আমরা এখন ভরসা করছি ডেমোক্রাট রাজনীতিবিদের উপর। কিন্তু তারা যদি ব্যার্থ হয়, আমরা আমাদের পরবর্তী করনীয় ঠিক করবো। আমরা বসে থাকবো না।’
-বলছিলেন অজেয় ইউসুফ।
এই লেখা যখন লিখছি তখনকার অগ্রগিত হচ্ছে, ২ দিন বন্ধ থাকার পর, ৩ সপ্তাহের জন্য সেটা স্থগিত ঘোষনা করা গেছে সিনেটে আইন প্রণেতাদের আলোচনায়। যেখানে, ড্রেমোকাটদের দাবী ছিল, আগে সরকার ঘোষনা দিক, ড্রিমাদের স্বপ্ন বহালের বাধা অপসারণ করা হবে, চেইন মাইগ্রেশন আর ডিভি লটারী বন্ধ হবে না। কিন্তু রিপাবলিকানরা বলছে, আগে সরকার যে বন্ধ হয়ে আছে সেটার কার্যক্রম ছাড় দেয়া হোক পরে আলোচনাটা এগিয়ে নেয়া যাবে। সেই দাবীতে একমত হয়ে, সরকারী কার্যক্রম চালাতে অর্থছাড়ে সম্মতি দিয়েছে ডেমোক্রাট সিনেটররা।এখন বাদ বাকী ৩ সপ্তাহে একটা দীর্ঘ মেয়াদী সুরাহা হবে বলেই আশা করছে সব পক্ষই। যেখানে ডেমোক্রাট দের এই সকল দাবী মেনে নেয়ার পরিবর্তে, সীমান্ত দেয়াল নির্মানের জন্য আগামি ৭ বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলার অর্থছাড় দেবার ব্যাপারে সম্পতি দিতে পারেন ডেমোক্রাট রা। এই বিষয়েও আপত্তি আছে ডেমোক্রাট শিবিরে। আপত্তি আছে আন্দোলন কারীদেরও।
বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ড্রিমার নাইম ইসলাম আর অজেয় ইউসুফের বক্তব্য বেশ পরিষ্কার এ ক্ষেত্রে।
‘ট্রাম্পের দাবী অনুয়ায়ী তো সবই মেনে নেয়া হচ্ছে। গর্ভমেন্ট বন্ধ হওয়ার বড় কারন হলো, এই ড্রিম এ্যাক্ট শুধু নয়। এর সাথে বাদবাকী অভিবাসন আইনের সংষ্কারের নামে যেসব বলা হচ্ছে সেগুলি। যেই দেয়াল নির্মান কখনই ডেমোক্রাটরা মেনে নেয়নি, সেটাতে অর্থছাড়ে কিভাবে সিনেট নেতা চাক শুমার রাজী হচ্ছেন সেটা আমরা বুঝি না। এর ফলে, আরো লক্ষ পরিবারকে তাদের সন্তানদের থেকে চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে। ইমিগ্রেশন এবং বর্ডার পুলিশের ফান্ডিং এত পরিমানে বাড়ানো হবে যে তারা মানুষের ঘুম হারাম করে দিতে পারে। আমরা চাইনা কেবল আমাদের দাবী পূরন হোক, আমরাই কেবল বৈধতা পাই। আমরা চাই, সকল অভিবাসন প্রত্যাশী মানুষের জন্য রাষ্ট্র নৈতিক আচারন করুক’ -বলছিলেন নাইম ইসলাম।
অজেয় ইউসুফের বক্তব্য একই রকম। ‘রাষ্ট্র আমাদেরকে ক্লিন অর্থাৎ পরিষ্কার একটি ডাকা প্রকল্পের ওয়াদা করেছিল। কোন সরকার করেছিল সেটা আমাদের বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো রাষ্ট্র করেছিল। সেই ওয়াদা রাষ্ট্র তুলে নিতে পারে না। আমরা শুনছি এখন, ডাকা প্রকল্পে ডোনাল্ড ট্রাম্প, খুব নোংরা কিছু কালিমা লেপন করতে চায়। সেটা আর ক্লিন থাকছে না। যেখানে, আমাদেরকে প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়ার পরও আরো একটা লম্বা সময় পাড়ি দিতে হবে নাগরিকত্বের জন্য। এমনিতেই দ্বিত্বীয় শ্রেনীর নাগরিকত্বের বোঝা আমাদের ঘাড়ে। এই কালিমাসহ প্রকল্পে নাকি প্রস্তাব করা হচ্ছে, আমরা নাগরিকত্ব পেলেও বাদ যাবেন আমাদের বাবা মায়েরা। এবং এই রকম কালিমাসহ একটি ডাকা প্রকল্পের বিনিময়ে ট্রাম্প, আরো হাজারো /লক্ষ পরিবারের উপর আইনী ছড়ি ঘোরাতেই সীমান্তে দেয়াল নির্মান করবেন, সেটাতে সম্মত হচ্ছেন ডেমোক্রাট দল, সেটা আমরা মেনে নিতে পারছি না’
এমন অনেক কিছুই মেনে নিতে পারছেন না ৭ লক্ষ ৯০ হাজার স্বপ্ন তারুন্য, যাদেরকে আমেরিকা ডাকে ড্রিমার হিসেবে। এই ড্রিমাররা এখন আরো সংগঠিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিচ্ছেন দীর্ঘ মেয়াদী জীবন যুদ্ধের প্রস্তুতি। ফেব্রুয়ারীর ৮ তারিখে যেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কোন রকম ছাড় না দেয়া হয় সেটাই আপাতত চাপ সৃষ্টির লক্ষ্য। পরেরটার জন্যেও ছক কষছেন বাংলাদেশী ড্রিমাররা, যারা কিনা এই প্রায় ৮ লক্ষ পরিবারের -ই অংশ।