অর্থনীতি বিশ্ব

পানামা খাল: বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট1 min read

আগস্ট ৩১, ২০১৯ 4 min read

author:

পানামা খাল: বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট1 min read

Reading Time: 4 minutes

পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে চার ভাগের তিন ভাগ পানি আর মাত্র এক ভাগ স্থল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাই মানুষের প্রয়োজনে কখনো জলাভূমি ভরাট করে বা সেতু নির্মাণ করে স্থলভাগকে সংযুক্ত করা হয়। অপরদিকে কখনো স্থলভাগকে কেটে জলাভূমি তৈরি করা হয়। মানবসৃষ্ট এসব জলাভূমিকে কৃত্রিম জলাভূমি বলা হয়। সাধারণত অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য এসব জলাভূমি খনন করা হয়। পানামা খাল তেমনি এক কৃত্রিম জলাভূমি। এটি বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। পানামা প্রজাতন্ত্রের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা কৃত্রিম খালটি ১৯০৪ সালে খনন করা হয়। পানামা প্রজাতন্ত্রে এর অবস্থান বলে এটি পানামা খাল নামে সমধিক পরিচিত। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কারণের পাশাপাশি পানামা খালকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণও আবর্তিত হয়। তাই অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক দিক বিবেচনা করলে পানামা খালের গুরুত্ব অত্যন্ত সুউচ্চে।

পানামা খালের পরিচিতি

পানামা খাল আমেরিকা মহাদেশের স্থলভাগকে বিভক্ত করেছে। সেইসাথে প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে এটি পানামা প্রজাতন্ত্রের ইস্থমাসে নির্মিত একটি ক্যানেল যা আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। ইস্থমাস হলো দুটি বড় ভূখণ্ডকে সংযোগকারী সরু ভূমি- যার দুপাশে সাধারণত পানি থাকে। পানামার ইস্থমাস একইসাথে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশকে আলাদা করেছে এবং প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরকে যুক্ত করেছে।

এর খনন কাজ ১৯০৪ সালে শুরু হয়ে ১৯১৪ সালে সমাপ্ত হয়। এটা খননের দায়িত্ব পালন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর দৈর্ঘ্য ৬৫ কি.মি. এবং প্রস্থ স্থানভেদে ৩০-৯০ মিটার পর্যন্ত। তবে আটলান্টিকের (আরো ঠিক করে বললে ক্যারিবীয় সাগরের) গভীর জলভাগ থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর জল পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য হিসেব করলে দাঁড়ায় ৮২ কি.মি.। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫ ফুট উপর দিয়ে পানামা খাল প্রবাহিত হয়েছে। পানামা খাল এজন্যই ব্যতিক্রমী। এত উঁচু দিয়ে পানি প্রবাহ চলমান রাখার জন্য এর রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতিও বেশ চ্যালেঞ্জিং। জাহাজ পারাপার করার সময় বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। পানামা খাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা সমগ্র আমেরিকা মহাদেশের সাথে এশিয়া, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যের নতুন রূপ দান করেছে। পানামা খাল তৈরির ফলে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার জাহাজ চলাচলের দূরত্ব ৬৫০০ কি.মি. কমে গিয়েছে। তেমনি আমেরিকা যাওয়ার ক্ষেত্রে এশিয়া, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার জাহাজসমূহকেও ৩৫০০ কিলোমিটার পথ কম পাড়ি দিতে হয়।

পানামা খাল নির্মাণের ইতিহাস

আমেরিকা আবিষ্কৃত হওয়ার পরপরই সেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষজন এসে বসবাস শুরু করে। বিশেষ করে ইংরেজ, পর্তুগিজ, ডাচ, স্প্যানিশ ও ফরাসিরা নব্য আমেরিকায় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে গমন করে। দেখতে দেখতে আমেরিকায় ব্যবসা বাণিজ্যে বিপ্লব শুরু হয়। তখন দক্ষিণ আমেরিকা থেকে উত্তর আমেরিকার উপকূলে যাওয়ার জন্য কয়েক হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হতো। ফলে মালামাল পরিবহন ও চলাচলে নানা বিঘ্নতা তৈরি হতো। এ সমস্যা উতরানোর জন্য তখন অনেকেই চিন্তা করতে শুরু করে। ষোড়শ শতকে দীর্ঘ এ পথকে সংক্ষিপ্ত করার ভাবনা সর্বপ্রথম প্রকাশ করেন স্প্যানিশ অভিযাত্রী ভাস্কো নুয়েঞ্জ ডি বালবোয়াইন। তিনি মতপ্রকাশ করেন যে, প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা উচিত। কিন্তু মানুষের স্বভাবজাত ধর্মের কারণে তৎকালীন স্প্যানিশ রাজা তাঁর এ প্রস্তাবকে কোন চিন্তাভাবনা না করেই উড়িয়ে দেন। তবে তার পরবর্তী রাজা পঞ্চম চার্লস নুয়েঞ্জের এ প্রস্তাবকে বিবেচনার উদ্দেশ্যে ১৫৩৪ সালে একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটি এ গৃহীত প্রস্তাব পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন পেশ করে। সেখানে তাঁরা উল্লেখ করেন যে, ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের মতো খাল খনন অসম্ভব। ফলে খাল খননের প্রস্তাব সেখানেই থেমে যায়।

এরপর উনিশ শতকের শেষের দিকে খাল খননে এগিয়ে আসে ফ্রান্স। কিন্তু পানামা অঞ্চলটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫ ফুট উঁচু এবং জঙ্গলাকীর্ণ হওয়ায় সেখানে খাল খনন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অবশেষে ফ্রান্স ১৮৮১ সালে পানামা খাল খননের কাজ শুরু করে। কিন্তু ফ্রান্স তখনও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ততটা উন্নত ছিল না, তার উপরে সেখানকার প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা ও শ্রমিকের উচ্চ মৃত্যুহার  সবকিছু মিলিয়ে ফ্রান্স পানামা খাল খননের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। পানামা খাল খনন করতে গিয়ে ফ্রান্সের প্রায় বিশ হাজার শ্রমিকের অকাল মৃত্যু হয়।

আরো কয়েক বছর পর এগিয়ে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা তাদের দক্ষ কারিগর আর প্রযুক্তি নিয়ে পানামা খাল খননের জন্য আটঘাট বেঁধে মাঠে নামে। কিন্তু বিপত্তি বাধে আরেক জায়গায়। পানামা প্রজাতন্ত্র তৎকালীন কলম্বিয়ার অধীনস্থ ছিল। তাই কলম্বিয়া পানামা খাল খননে বাধা দেয়। কৌশলী যুক্তরাষ্ট্র তখন পানামাকে কলম্বিয়ায় অভ্যুত্থানের জন্য উসকে দেয়। তারই ফলশ্রুতিতে পানামা ১৯০৩ সালে কলম্বিয়ায় এক অভ্যুত্থান ঘটায় এবং পানামা কলম্বিয়া থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে। পানামা স্বাধীন হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের খাল খননের পথ সুগম হয়। ১৯০৪ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামা খাল খনন কাজ শুরু করে। দীর্ঘ দশ বছর পর প্রায় ৫৬০০ শ্রমিকের প্রাণের বিনিময়ে ১৯১৪ সালে এর খনন কাজ সম্পন্ন হয়।

পানামা খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল পদ্ধতি

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫ ফুট উঁচু একটা খাল দিয়ে সাগরে জাহাজ পারাপার করানো মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। পানামা খালে পানির স্রোত বজায় রাখা থেকে শুরু করে জাহাজ পারাপার পর্যন্ত সমস্ত কাজ যান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পানামা খালে মোট তিন জোড়া জল কপাট রয়েছে যেগুলোর সাহায্যে খালের পানি ধাপে ধাপে সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ৮৫ ফুট পর্যন্ত উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

কপাটগুলো দুটি ধাতব কব্জা দিয়ে তৈরি। প্রত্যেকটি কব্জা ৭ ফুট চওড়া এবং অবস্থান অনুযায়ী ৪৭ ফুট থেকে ৮২ ফুট পর্যন্ত উঁচু। এসব কব্জা জাহাজ চলাচলের সময় খুলে বা বন্ধ করে পানির স্তর বাড়ানো বা কমানো হয় যাতে করে নির্বিঘ্নে জাহাজ এগুতে পারে।

২০১৪ সাল থেকে পানামা খাল দিয়ে একসাথে দুটি জাহাজ চলাচল করতে পারে। এর আগে একই সময়ে দুটি জাহাজ চলাচল করতে পারত না। জাহাজ পারাপারের জন্য চ্যানেলের উভয় পাশে শক্তিশালী ক্রেন ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া পানির স্তর স্বাভাবিক রাখতে কাজ করে অত্যন্ত শক্তিশালী কয়েকটি পাম্প। চ্যানেলের প্রস্থ ১১০ ফুট হওয়ায় এর উপর দিয়ে ১১০ ফুটের চেয়ে কম চওড়াবিশিষ্ট জাহাজ চলাচল করতে পারে।

পানামা খাল দিয়ে ২০১৮ অর্থবছরে ৪৪ কোটি ২০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে

পানামা খালের গুরুত্ব

পানামা খাল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব-পশ্চিম উপকূলে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ১৫০০০ কি.মি. (৮০০০ নটিক্যাল মাইল) পথ কমিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, উত্তর আমেরিকার উপকূল থেকে দক্ষিণ আমেরিকার আরেক উপকূলে যেতে ৩৫০০ কি.মি. পথ কমিয়ে দিয়েছে। এই খাল দিয়ে বছরে প্রায় ৬০০০ জাহাজ চলাচল করে এবং দৈনিক গড়ে ৫০ থেকে ৬০ টি জাহাজ চলাচল করে। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রগামী প্রায় ৫৫% জাহাজ পানামা খাল দিয়ে চলাচল করে। গোটা বিশ্ববাণিজ্যের ৫% সংঘটিত হয় এই পথে। পানামা প্রজাতন্ত্র পানামা খাল থেকে বছরে ৭০-৮০ কোটি মার্কিন ডলার রাজস্ব আয় করে যা তাদের জাতীয় আয়ের এক-তৃতীয়াংশ।

পানামা খাল পানামা প্রজাতন্ত্রে অবস্থিত হলেও একসময় এটি মার্কিনদের নিয়ন্ত্রনে ছিল। কিন্তু বহু কাঠ-খর পোড়ানোর পর ১৯৯৯ সালে পানামা খালের পূর্ণ মালিকানা পানামার হাতে হস্তান্তর করা হয়। তারপরও পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা মার্কিনদের হাতে রয়েই গেছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ পানামা খালের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। রয়টার্স ও ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, ২০২০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিতে বিশ্বে তৃতীয় স্থান দখল করবে। আর এই এলএনজি রপ্তানিতে পানামা খাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট। পানামা ক্যানেল অথরিটির প্রধান জর্জ কুইজানোর মতে, বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যে পানামা খালের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ২০১৭ সালে এ খাল দিয়ে ৬০ লাখ টন এলএনজি বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছেছে। ২০২০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ তিন কোটি টনে দাঁড়াবে।

লেখক- নিশাত সুলতানা 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *