বিনোদন

অদ্বিতীয় শাহরুখ1 min read

নভেম্বর ১৫, ২০১৯ 5 min read

author:

অদ্বিতীয় শাহরুখ1 min read

Reading Time: 5 minutes

‘আশিক হু ম্যায়, পাগাল ভি হু

সাবকি দিলো মে শামিল ভি হু।‘

‘বাদশাহ’ চলচ্চিত্রের গানটার সাথে হুবহু মিলে যায় বলিউডের কিং খানের উত্থান-পতন। নভেম্বরের ২ তারিখে ৫৪ বছরের কোঠায় পা দিলেন বলিউডের বাদশাহ শাহরুখ খান। গত ২৫ অক্টোবর নেটফ্লিক্সের ‘David Letterman Show’ তে শাহরুখের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। এতে তাঁর সংগ্রাম, দাম্পত্য, ক্যারিয়ার সবকিছুই উঠে আসে। এটি প্রচারের পর মিডিয়াজগতে প্রশংসার যে ঝড় বইলো তাতে বোঝাই যায়, সদা হাস্যময় এই নায়কের আবেদন এখনো একবিন্দু কমেনি দর্শকের কাছে। 

শূন্য থেকে বাদশাহ

১৯৬৫ সালের ২রা নভেম্বর ভারতের দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন রোমান্সের বাদশাহ। বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ খান ছিলেন একজন স্বাধীনতা কর্মী। শাহরুখ কিন্তু শৈশবে হিন্দিতে কাঁচা ছিলেন। মায়ের আগ্রহেই ক্রমে পোক্ত হন এই ভাষায়।শাহরুখ যখন ফিল্মি ক্যারিয়ার শুরু করেন তখন বাবা-মা কেউই পৃথিবীতে ছিলেন না।

টেলিভিশন সিরিয়াল দিয়ে কাজ শুরু করলেও ধীরে ধীরে রূপালি পর্দায় জায়গা করে নেন তিনি। ১৯৮৮ সালে ‘ফৌজি’ দিয়ে টেলিভিশনে অভিষেক ঘটে শাহরুখের। তবে চলচ্চিত্রে প্রথম দেখা যায় ১৯৯১ সালের ‘দিওয়ানা’তে, যদিও হেমা মালিনীর ‘দিল আশনা হ্যায়’  ছবিতে প্রথম কাজ করেন । পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি উচ্চতার সুদর্শন শাহরুখ অবশ্য ছবিতে নামার আগেই স্কুলজীবনের প্রেমিকা গৌরি খানকে বিয়ে করেন। তিন দশকের সংসারে এক কন্যা ও দুই পুত্রও আছে তাঁদের। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ২০০৫ সালে ভারত সরকারের কাছ থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কার লাভ করেন তিনি। রেকর্ড ১৪ টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও আছে তার ঝুলিতে।

শাহরুখের সেরা পাঁচ

২৭ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে হিটের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে সুনাম কুড়ালেও এর বাইরেও নিরীক্ষা করেছেন তিনি। মূল অভিনেতা থেকে শুরু করে পার্শ্ব, ক্যামিও, কণ্ঠাভিনেতা হিসেবে এ পর্যন্ত ৯২ টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি। চলুন, এর মধ্য থেকে শাহরুখের সেরা পাঁচ পারফরম্যান্স সম্পর্কে জেনে নিই। 

Baazigar (১৯৯৩)

‘বাজিগরে’ খুনি চরিত্রে অভিনয় করে বিপুল প্রশংসিত হন শাহরুখ

আব্বাস মাস্তানের ‘বাজিগর’ আদতেই শাহরুখের জন্য বাজির ঘোড়া ছিল। নেতিবাচক চরিত্রে সুঅভিনয় করেও যে লাখো ভক্তের হৃদয় জয় করা সম্ভব ‘অজয় শর্মা’ হয়ে তাই করে দেখিয়েছিলেন হার্টথ্রব শাহরুখ। পিতৃহত্যার প্রতিশোধে উন্মাদ এক তরুণের চরিত্রে অভিনয় করে সেবছর ফিল্মফেয়ার ঝুলিতে ভরেন তিনি।

এই ছবির মাধ্যমেই দর্শক কাজল-শাহরুখ জুটির প্রথম স্বাদ পায়। শিল্পা শেঠির অভিষেকও হয়েছিল ‘বাজিগর’ দিয়ে। জাভেদ সিদ্দিকি, আকাশ খুরানা ও রবিন ভাটের কাহিনীতে নির্মিত এই ছবিটি অন্যতম সেরা হিন্দি থ্রিলার। দালিপ তাহিল, জনি লিভার, রাখি গুলজার প্রমুখ থাকলেও মূল লাইমলাইট ছিল শাহরুখের উপরই। সেসময় বক্স অফিসে ১৮.৩ কোটি রূপি আয় করে বাজিগর। আনু মালিকের সুরে ‘বাজিগর মে বাজিগর’, ‘ইয়ে কালি কালি আঁখে’, ‘অ্যা মেরি হামসাফার’ গানগুলো ছিল জনতার মুখে মুখে।

Dilwale Dulhania Le Jaynge (১৯৯৫)

বলিউড মানেই ‘রাজ-সিমরান’ জুটি

পঁচানব্বইয়ের ২০ অক্টোবর। প্রখ্যাত পরিচালক যশ চোপড়ার পুত্র আদিত্য চোপড়ার পরিচালক হিসেবে অভিষেক সেদিন। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করে দেয় এই নবীন পরিচালক। বলিউডে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক ছবি হিসেবে রেকর্ড গড়ে নেয় ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’। শাহ্রুখ-কাজল জুটির রোমান্সে আগে থেকেই বিভোর ছিল দর্শক। এবার রাজ-সিমরান রূপে তাদের দর্শকদের সেই উন্মাদনা যেন আরও উস্কে দিয়েছিল এই ছবিটি। 

৩ ঘণ্টা ৯ মিনিটের সিনেমায় দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ থাকলো হপ্তার পর হপ্তা। মুম্বাইয়ের মারাঠা মন্দির থিয়েটারে  টানা ২০ বছর চলে এই ছবিটি। গোটা সিনেমাজুড়ে রোমান্স তো বটেই আইকনিক দৃশ্যেরও ছড়াছড়ি। হলদে সরিষা ক্ষেতে রাজ-সিমরানের আলিঙ্গন কিংবা চলন্ত ট্রেনে রাজ-সিমরানের মিলন- সবকিছুই পরবর্তী বলিউডি রোমান্সের কাঠামো গড়ে দিয়েছে। দুই তরুণ তরুণীর নিটোল প্রেম আর পারিবারিক টানাপোড়েন পেড়িয়ে কাছে আসার গল্পই ছিল এর প্রতিপাদ্য। সিমরানের বাবা বলদেব হিসেবে প্রয়াত অমরিশ পুরি ছিলেন অনবদ্য। মনমোহন সিংয়ের অপূর্ব সিনেমাটোগ্রাফির গুণে সেই নব্বইয়ের ক্যামেরাতেও উঠে আসে প্রকৃতি ও প্রেমের অসামান্য সৌন্দর্য। যতীন-ললিত ছিলেন সেসময়ের শীর্ষ সুরকার। তাঁদের কম্পোজিশনে ‘মেরে খাব মে জো আয়ে’, ‘রুক যা ও দিল দিওয়ানে’, ‘মেহেন্দি লাগা কে রাখনা’, ‘হো গায়া হ্যা তুজকো প্যায়ার সাজনা’, ‘তুঝে দেখা তো হ্যা জানা সানাম’ সহ সব গানই পায় তুমুল করতালি। ৪০ মিলিয়ন রূপির এই ছবি আয় করে নিয়েছে ১.৩ বিলিয়ন রূপি। 

এই ছবির জোরেই শাহরুখ মূলত ‘কিং অফ রোমান্সে’ পরিণত হন। এর আগে অধিকাংশ ছবিতেই তাঁকে নেতিবাচক চরিত্রে দেখা যেতো। তবে মজার কথা হচ্ছে, আদিত্য প্রথমে রাজ চরিত্রে হলিউড অভিনেতা টম ক্রুজের কথা ভেবেছিলেন। পরে অবশ্য সাইফ,সালমান,আমির সবার কাছ থেকে ফিরে এসে শাহরুখকেই কাস্ট করেন তিনি।  

Swades (২০০৪)

বলিউডের অন্যতম ক্লাসিক চলচ্চিত্রের তালিকায় স্বমহিমায় উজ্জ্বল ‘স্বদেশ’। আশুতোষ গোয়াড়িকরের এই ছবি দেখে শিহরিত হন নি এমন লোক পাওয়া দুষ্কর। ছবিতে ভারতের গ্রামীণ হালচাল, মুক্ত হাওয়া-বাতাসের স্নিগ্ধ রূপের সাথে সাথে বিদ্যুৎ অব্যবস্থাপনার ব্যাপারটিও উঠিয়ে নিয়ে আসেন পরিচালক। 

‘নাসা’র একজন ভারতীয় কর্মকর্তা মোহন। কাজের খাতিরেই ভারতের উত্তর প্রদেশে আসে সে। পরিকল্পনা ছিল, কাজ শেষে ফের তল্পিতল্পা গুটিয়ে সেই মার্কিন মুলুকেই পাড়ি জমাবে। কিন্তু স্বদেশি মাটির ঘ্রাণ আর সরল জীবনযাত্রার সাথে খুব দ্রুতই মিশে যায় সে। এর মাঝেই সে আবিষ্কার করে, গ্রামে আর যাই হোক প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ঠিক মিলছেনা। পরবর্তীতে মোহনের নিরলস চেষ্টায় ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করা হয়। 

অগাধ দেশপ্রেমের ছবি ‘স্বদেশ’

ছবির মূলগল্প অরবিন্দ পিল্লালামারি ও রবি কুচিমাঞ্চি যুগলের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। এই প্রবাসী দম্পতির প্রচেষ্টার ফলেই ভারতের বহু গ্রামাঞ্চল বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসে।‘ স্বদেশ’ই প্রথম ভারতীয় ছবি যার চুম্বক অংশ চিত্রায়িত হয়েছে ফ্লোরিডার ‘নাসা’য়। সেরা সিনেমাটোগ্রাফির গুণে মহেশ আনে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে নেন এবং ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জেতেন বাদশাহ খান। এ আর রহমানের সুরে এ ছবির ‘এ তারা ও তারা’, ‘ ইয়ে জো দেশ হ্যায় তেরা’, ‘ইউ হি চালা চালা’ প্রভৃতি গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তাও পায় সেসময়। শাহরুখের ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক এই ছবির জন্য কিন্তু প্রথম প্রস্তাব পেয়েছিলেন ঋত্বিক রোশন। ঋত্বিক স্ক্রিপ্ট ফেরত দেয়াতেই শাহরুখ পেয়ে যান সেই সুযোগ। ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নির্মিত ছবিটি ৪.১ মিলিয়ন ডলার আয় করলেও দর্শকমনে স্থায়ী আসন গড়ে নেয়।   

Chak de India (২০০৭)

হকি কোচ হিসেবে অসাধারণ ছিল শাহরুখের পারফরম্যান্স

‘চাক দে ইন্ডিয়া’ শাহরুখের ফিল্মি ক্যারিয়ারের অন্যতম নন্দিত ছবি। প্রথাগত নায়কীর বাইরে নিজেকে আরেকবার প্রমাণ করতে সমর্থ হন কিং খান। যশরাজ ফিল্মসের ব্যানারে শিমিত আমিন পরিচালিত এই ছবিতে শাহরুখ অভিনয় করেন একজন হকি কোচ হিসেবে। ১৬ নারীর হকি টিমের কোচ ‘কবির খান’ হিসেবে প্রথমে সালমানকে ভাবা হলেও পরে বাদশাহর কপালেই জোটে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া এই ছবিটি। চাক দে ইন্ডিয়াতে কাজ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কলেজে থাকাকালীন হকির সাথে যুক্ত ছিলাম। এরপর সেভাবে খেলা হয়নি। হকি আমাদের জাতীয় খেলা হলেও এ নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখা যায়না, কাজও কম হয়। আমার মনে হয়, এই জায়গাটা নিয়ে ভাবা উচিত।‘ 

সেবছর ৬.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নির্মিত ছবিটি আয় করে ৪১ মিলিয়ন ডলার। শাহরুখ ছাড়াও এতে অভিনয় করেছেন শিল্পা শুক্লা, বিদ্যা মাল্ভারে, জয়শ্রী অরোরা প্রমুখ। আর সুর সম্পাদনায় ছিলেন সেলিম-সোলায়মান জুটি।

My Name is Khan(২০১০) 

শাহ্রুখকে যখন একপেশে অভিনেতা বলে অনেকে দুয়ো দিচ্ছিলেন তখনই করণ জোহরের ‘মাই নেম ইজ খানে’ নিজের যোগ্যতা আবারও প্রমাণ করেন ‘ডন’। অ্যাস্পারগারস সিনড্রোমে আক্রান্ত যুবক রিজওয়ান খানের চরিত্রে দেখা যায় অনবদ্য শাহরুখকে। কাজলের সাথেও ২০০১ এ ‘কাভি খুশি কাভি গামে’র পর এই ছবিতে জুটি বেঁধে কাজ করেন। ২০১০ সালেই ১০০ কোটির ঘরে আয় করেছিল ছবিটি। ৬০তম বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের অফিসিয়াল সিলেকশনেও ছিল এটি। 

চ্যালেঞ্জিং চরিত্রেও সমান সাবলীল শাহরুখ

পশ্চিমা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়া এবং রাজনৈতিক স্পর্শকাতর ইস্যু উঠে আসায় খানিকটা বিতর্কও পোহাতে হয়েছে ছবিটিকে। তবে শাহরুখের অনিন্দ্য এবং চ্যালেঞ্জিং অভিনয় ছাপিয়ে গেছে সব আলোচনাকে। ছবিতে এছাড়াও ছিলেন জারিনা ওয়াহাব, জিমি শেরগিল ,সোনিয়া জেহান। ছবির প্রিমিয়ারের কিছু আগেই শাহরুখকে আমেরিকার নিউ আর্ক বিমানবন্দরে ‘খান’ পদবি থাকার জন্য  অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। 

গত তিন দশক ধরে বলিউডে রাজত্ব করে গেলেও এখনও নিজেকে ক্ষুদ্রই মনে করেন কিং খান। ডেভিড লেটারম্যানের শো তে এসে তাই নির্দ্বিধায় বলে গেলেন, ‘আমি আসলে ‘এসআরকে ইমেজ’টার চাকরি করি, এছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু আমি ক্লান্ত নই। আমি এটাকে ভালোবাসি। বাসবোই বা না কেন? কোটি মানুষের ভালোবাসা পাওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়।‘ 

লেখক- সারাহ তামান্না 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *